নোটিফিকেশান
“প্রেমিকার উষ্ণ বুকে, হাত আমার সেঁকব সুখে।”
“আবার অসভ্যতামি শুরু করলি, তুই না একটা যাচ্ছেতাই।”
হোটেলের রুমে ঢুকে সবে ড্রেসটা চেঞ্জ করতে শুরু করেছিল সর্বাণী, আর তখনই আচমকা শোভনের পেছন থেকে জড়িয়ে ধরা।
“ওহ্ আমি অসভ্য হয়ে গেলুম, আর শালা এই শীতকালে মন্দারমণি আসতে কে বলেছিল? এইবারে ঠ্যালা বোঝ।”
“শীতে কি বেড়াতে নেই?”
“নাহ্, এই সময়ে লেপের তলায় ঢুকে জমিয়ে প্ৰেম করার দিন।”
“এই এগোবি না একদম বলছি, সমুদ্রে ডুবকি মারার আগে কিচ্ছু নয় কিন্তু।”
“তবে রে, দাঁড়া মজা দেখাচ্ছি…!”
“শোভন, শোভন, দরজাটা খোল বাবা, আর কতদিন এভাবে নিজেকে বন্ধ করে রাখবি, যে যাওয়ার সে তো চলেই গেছে।” দরজার ওপর একপ্রস্থ ব্যস্ত হাতের আওয়াজে চিন্তার জালটা ছিঁড়ে যায় শোভনের।
“আজ চার দিন হয়ে গেল, এই এভাবে নিজেকে ঘরবন্দি করে রেখেছিস, তুই এভাবে সমাজ-সংসার-জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ালে কি সর্বাণী ফিরে আসবে তোর কাছে?”
“আহ্, তোমরা আমাকে একটু একা ছাড়বে! কতবার বলেছি আমি একটু একা থাকতে চাই।”
“আজকের দিনটায় অন্তত একটু বেরিয়ে আয় বাবা, এতটা অবুঝ হোস না।”
“আহ্! আমাকে একটু মুক্তি দেবে তোমরা?”
পাশে রাখা শুকিয়ে যাওয়া রজনিগন্ধার ফুলদানিটা সজোরে ছুড়ে মারে শোভন দরজার দিকে, ঝনঝন শব্দে চারদিকে ভাঙা কাচ ছড়িয়ে পড়ে। বাইরের চিৎকারগুলো আস্তে আস্তে থেমে যায়, ওরা নিরাশ হয়ে পড়ে বোধহয়।
সেবার মন্দারমণিতেই মাথাব্যথাটা শুরু হয়েছিল সর্বাণীর, ফিরে এসে একগাদা টেস্ট, একগাদা ওষুধ ডাক্তার, আশীর্বাদ প্রার্থনা মন্দির মসজিদ, কিন্তু নাহ্ কিছুতেই কিছু লাভ হয়নি, ধরা পড়েছিল ব্রেন টিউমার, লাস্ট স্টেজ। অথচ আগে কিছু বোঝাই যায়নি কিন্তু, যখন বোঝা গেল, তখন বড্ড দেরি হয়ে গেছে, ছমাসের সংগ্রাম শেষ হয়ে গেছে চার দিন আগেই, এই নিজের হাতেই শর্বানীকে বিদায় জানিয়ে এসেছে সে…।
নাহ্, আর সে পারছে না, মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে যন্ত্রণায়, তার শরীর আর দিচ্ছে না, থরথর করে কাঁপছে, মনে হচ্ছে এক্ষুনি সে মুখ থুবড়ে পড়ে যাবে, কিন্তু তাকে তো জেগে থাকতেই হবে, আজ যে সেই দিন।
“ধুর বোকা, তুই কাঁদছিস কেন, আমি কি তোকে চিরদিনের জন্য ছেড়ে যাচ্ছি নাকি? আমার হাত থেকে তোর এত সহজে মুক্তি নেই, এই পাগল ছেলে চোখ মোছ আর আমার দিকে তাকা, তোকে শক্ত থাকতেই হবে, আমার জন্য বাঁচতে হবে তোকে, বল পারবি না?”
“পারব।”
“ঠিক তো? কথা দিচ্ছিস তো আমাকে? তুই কথা রাখলেই কিন্তু আমি ঠিক ফিরে আসব তোর কাছে।”
সর্বাণীর সাথে বলা শেষ কথাগুলো ছিল এটাই, কিন্তু নাহ্ সে নিজেকে শক্ত রাখতে পারেনি, আসলে সম্ভবও ছিল না, সেই স্কুলজীবন থেকে যে সম্পর্কের সূত্রপাত, তারপর কলেজের সিঁড়ি বেয়ে বিয়ের পিঁড়িতে যে স্বপ্নগুলো একটু একটু করে সেজে উঠছিল, সেটা আচমকা এভাবে শেষ হয়ে যাবে কেন?
যে সর্বাণীকে ছেড়ে এক মুহূর্তও কাটানো তার পক্ষে সম্ভব ছিল না, আজ তাকে ছেড়েই গোটা জীবন কাটাতে হবে শোভনকে?
এই প্রশ্নগুলো বারবার সে নিজেকে করেছে, কিন্তু উত্তর দেবে কে? সে জানে না। সে শুধু জানে তার সর্বাণী তাকে কথা দিয়েছে মৃত্যুশয্যায়, সে ফিরে আসবে।
দেয়াল ঘড়িটার দিকে বারবার তাকাচ্ছে শোভন, আর একটু পরে বারোটার কাঁটা ছোঁবে ঘড়িটা। আর তারপরেই…।
তারপরেই? তারপরেই কী হবে? সে যা আশা করছে সেটা কি কোনোদিনও সম্ভব? আচ্ছা সে পাগল হয়ে যাচ্ছে না তো? কিন্তু সর্বাণী যে কথা দিয়েছে সে আসবে ফিরে, দীর্ঘ ৭ বছরের অভ্যাসটা কি সে ভুলে থাকতে পারবে?
হা ঈশ্বর, মাথার চুলগুলোকে সজোরে টেনে ধরে শোভন, মনে হয় উপড়ে নিলে বোধহয় শান্তি মিলবে।
কুক কুক কুক কুক, টেবিলের ওপরে থাকা শোভনের মোবাইলটা বাজতে শুরু করে, এই রিংটোন শোভন চেনে, এক ঝটকায় সে উঠে বসে বিছানার ওপর, ঘড়ির দিকে তাকায়, ঠিক ১২টা।
তবে কী? তবে কী? তার স্বপ্নটাই সত্যি হতে চলেছে? এক লাফে সে বিছানা থেকে টেবিলের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে।
কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটাকে তুলে নেয়, স্ক্রিনে দেখতে পায় ‘সর্বাণী কলিং’, কিন্তু এ কী করে সম্ভব, সে নিজের হাতে যে তাকে… তবে কি তার সর্বাণী সত্যিই লাস্ট সাত বছরের মতো তাকে ঠিক ১২টায় বার্থডে উইশ জানাচ্ছে? নাকি কেউ তার সাথে নিছক মজা করছে। টেবিলের ড্রয়ারটা এক ঝটকায় সে টেনে মাটিতে ফেলে, বিকট আওয়াজ করে সেটা মেঝেতে এসে পড়ে। এলোমেলো ভাবে চারিদিকে ছিটকে পড়া ড্রয়ারের জিনিসগুলোর মাঝে পাগলের মতো হাতড়ে চলে শোভন।
ওই, ওই তো সর্বাণীর মোবাইলটা, কিন্তু এটা তো সুইচ অফ। তবে কি সিমটা কেউ নিয়ে… নাহ্ সিমও তো জায়গায় লাগানোই আছে, শোভনের চোখ দিয়ে টুপ করে এক ফোটা জল বেরিয়ে পড়ে মোবইলের ওপর, ‘সর্বাণী কলিং” লেখাটা কেমন যেন অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে, গত চারদিন ধরে সে যে মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করে আছে, আজ সেই সময় এসে উপস্থিত। কিন্তু সে ফোনটা রিসিভ করতে পারছে না কেন, সে কি ভয় পাচ্ছে? তবে ভয় কি ভালোবাসাকে হারিয়ে দিচ্ছে? নাহ্, বিকট একটা একটা আর্তচিৎকার করে ওঠে শোভন।
***
“স্যার, প্লিজ একবার রুম নাম্বার ৪৯৯-তে আসুন, পেশেন্টের জ্ঞান ফিরছে।”
প্রচুর আলো, চোখ ধাঁধিয়ে যায় শোভনের, সাদা পোশাক পরা ওরা কারা দাঁড়িয়ে আছে? এটা কি হাসপাতাল নাকি, সে এখানে কী করে এল? সর্বাণী কোথায়? ওই তো মা- বাবা, কিন্তু ওরা কাঁদছে কেন? তার কী হয়েছে? সে হাসপাতালের বেডেই বা কেন? তার মাথায় এই বড়ো হেলমেট কে লাগাল? উফ কী ভারী সেটা, চারদিকে কত তার লেগে আছে সেই হেলমেটে, আর কত মনিটর, কত মেশিনারি, কিন্তু কেন? কে দেবে তার এসব প্রশ্নের উত্তর?
“আর কাঁদবেন না মিস্টার অ্যান্ড মিসেস রায়, আপনাদের ছেলে সম্পূর্ণ সুস্থ এখন, ওকে কদিনের মধ্যেই বাড়ি নিয়ে যেতে পারেন। তবে ওকে মাঝে মাঝে কিন্তু কাউন্সিলিং-এ নিয়ে আসতে হবে আমার কাছে।
এক কাঁচাপাকা চুলের মধ্যবয়সি ডাক্তারকে এগিয়ে আসতে দেখতে পায় শোভন। সবাই কেমন একটা শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে, ভদ্রলোকের মুখে একটা হালকা হাসি, সবাই রাস্তা ছেড়ে দিচ্ছে কেমন
“কাউন্সেলিং? কী হয়েছে আমার কেউ আমাকে বলবে? মা-বাবা, কী হচ্ছে এগুলো?”
“ধীরে ধীরে ইয়ং ম্যান। উত্তেজিত হয়ো না। তোমার মা সব বলবেন তোমাকে, তুমি ভালো হয়ে গেছ। শোভনের মাথার চুলের হাত বুলিয়ে দেন সেই মানুষটা।”
“আমরা যে কী বলে আপনাকে ধন্যবাদ জানাব স্যার, আজ কতদিন পর যে ও আমাদের মা-বাবা বলে ডাকল।”
“উঁহু আমাকে, নয় সব অলমাইটির আশীর্বাদ, নাউ এক্সিউজ মি আমাকে একটু আসতে হবে, আপনারা থাকুন, চললাম ইয়ং ম্যান, আবার পরে দেখা হবে।”
শোভনের মা-বাবা অবাক চোখে দেখতে থাকেন ডাক্তার ফ্রান্সিসের আকস্মিক চলে যাওয়াটা, যেন ঝড়ের গতিতে বেরিয়ে যান ভদ্রলোক। অবাক হয় না নার্স শেলি, সে জানে প্রতিটা পেশেন্টের রিকভারির পর ডাক্তারবাবু কোথায় যেন বেরিয়ে যান দুম করে, সেদিন আর ফেরেন না।
.
সেটা শুধু জানে ডিসুজা, ডাক্তার ফ্রান্সিসের ড্রাইভারটা। তাই সে রেডি হয়েই ছিল, ডাক্তারবাবু এসে বসতেই কালো রঙা মার্সিডিজটা এক গলা ধোঁয়া ছেড়ে বেরিয়ে যায়। সামনের আয়নায় ডিসুজা আড়চোখে ডাক্তারবাবুকে দেখতে থাকে, কী নিরুত্তাপ এই মানুষটা, কী বিশাল খ্যাতি, সবাই ভগবান বলে জ্ঞান করে থাকে, অথচ এই মানুষটার কাজকে সরকার এখনও সরাসরি সম্মতি দেয় না। কী নাকি তিনি অলটারনেটিভ ওয়েতে কাজ করেন, এক্সপেরিমেন্টাল ফেজ। আরে বাপু তোদের ডাক্তারদের মতো পাগলদের গারদে ল্যাংটো করে রাখলেই কি তারা সেরে উঠত, কে জানে বাপু সরকারের মতিগতি মাঝে- সাঝে বোঝা দায়।
.
‘জানো জেসমিন, শোভনকে নিয়ে যখন ওর বাবা- মা প্রথমবার আমার কাছে এসেছিল, একটা জড়ানো মাংসপিণ্ড। কোনো সাড় ছিল না। আই আই টি খড়গপুর পাশ, কী ব্রিলিয়ান্ট ছেলে, কিন্তু স্বপ্নের স্টার্টআপের সাডেন কোলাপশন, ড্রাগস, পরপর সুইসাইডস অ্যাটেম্পটস, বড্ড ক্রিটিকাল ছিল এবারের কেসটা জানো। বাঁচার ইচ্ছেটাই হারিয়ে ফেলেছিল ছেলেটা। কিন্তু আমি পেরেছি জেসমিন, পেরেছি আবার ওকে স্বপ্নের মোহভঙ্গ দিয়েই ওর মৃত স্বপ্নের চারটে মুখস্থ দেয়াল ভেঙে আবার বাস্তবের মাটিতে এনে দাঁড় করাতে। রক্তমাংসের একটা পিণ্ড থেকে আবার একটা সংবেদনশীল মানুষে ফিরিয়ে দিতে। আমি পেরেছি কেন জানো, শুধু তোমার জন্য।’ মেসেজটা বড্ড বড়ো হয়ে গেল, জেসমিন আবার বড়ো মেসেজ পছন্দ করে না। আচ্ছা পড়বে তো সে? মুখে একটা হাসি খেলে যায় ডাক্তার ফ্রান্সিসের। ধুস, বাচ্চাদের মতো তিনি কী ভাবছেন, হোয়াটস্অ্যাপের সেন্ড বোতামটা টিপে দেন তিনি। ডিসুজা অবাক হয়ে দেখতে থাকে, এত বড়ো মানুষটা কিন্তু কীরকম একা একা হাসছে দ্যাখো, কে জানে বাপু বড়ো মানুষদের মতিগতি সে ঠিক ধরতে পারে না যেন।
গাড়িটা এসে দাঁড়ায় একটা পরিত্যক্ত কবরখানার সামনে। দরজা খুলে নেমে আসেন ডাক্তার ফ্রান্সিস, ধীর পায়ে এগিয়ে যান গেটের দিকে।
ক্যাঁচ করে শব্দ করে কবরখানার গেটটা খুলে যায়, এগিয়ে যান ডাক্তারসাহেব। একটার পর একটা জীর্ণ কবর সাবধানে এড়িয়ে একটার সামনে স্থির হয়ে দাঁড়ান তিনি। হাঁটু মুড়ে বসে পড়েন। হাতের কালো গোলাপগুলো নামিয়ে রাখেন, দু হাত দিয়ে কবরের ওপর জমে থাকা পাতাগুলো সরাতে থাকেন তিনি। এমন সময় গোঁ-গোঁ করে পকেটের মোবাইলটা বেজে ওঠে, পকেট থেকে বের করে আনেন মোবাইলটা তিনি, হোয়াটস্অ্যাপের নোটিফিকেশান, মেসেজ এসেছে জেসমিনের, ‘আই নো মাই ডিয়ার, ইউ ক্যান ডু ইট, এন্ড ইউ হ্যাভ টু ডু ইট এগেইন এন্ড এগেইন ফর মি. আই উইল অলওয়েজ বি উইথ ইউ. আর একটা লাভ স্মাইলি।’
উঠে পড়েন ডাক্তার ফ্রান্সিস, এবারে ফিরতে হবে, ধীর পায়ে পেছনে ফিরতে থাকেন তিনি, হঠাৎ এক দমকা হাওয়া ভেসে আসে, যেন সজোরে আলিঙ্গন করতে চায় তাকে। দাঁড়িয়ে পড়েন তিনি, দু হাত বাড়িয়ে কাকে যেন প্রতিআলিঙ্গন করেন। মৃদু হেসে পেছনে ফিরে তাকান একবার সেই কবরটার দিকে। হাওয়ার তোড়ে একটু একটু করে সব ঝরা পাতা সরে যাচ্ছে কবরের ওপর থেকে, সেমেট্রি মেমোরিয়াল প্লেটটা এবারে স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
.
‘ইন লাভিং মেমরি অফ, ওয়াইফ, ফ্রেন্ড, গাইড জেসমিন ফ্রান্সিস
ডিসেম্বর ১৪, ১৯৮০ – জানুয়ারি ৩০, ২০০৯’







