মাসিন্দা

‘If you missed the train I’m on,
You will know that I am gone,
You can hear the whistle blow,
A Hundred miles!’

দিল্লি রোড ধরে হু হু করে ছুটে চলেছে আমাদের গাড়িটা।

“এই গানটার একটা স্বদেশি ভার্সান আছে, জানা আছে?” গাড়ির সামনের সিট থেকে প্রশ্ন ভেসে এল সৌরভের।

“সুরটা কানে এলেই মালুম পড়ে, এ আর এমন শক্ত কী?” আমি জবাব দিলাম।

“না কোই হ্যায়, না কোই থা, জিন্দেগি মে তুমহারে সিবা, তুম দেনা সাথ মেরা, ও হাম নবা… দে আর একটা পেগ বানা দেখি!”

“ভাই এই তো সবে ট্রিপ শুরু হল, এখনই সব শেষ করে ফেলবি নাকি?”

“শেষ হলে হবে, আসানসোল থেকে আবার তুলব। হিসেব করে খাব বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছি নাকি শালা?”

“নাহ্ সেটা না, তা বলে সকাল সকাল এত খাবি?”

“সমন্তকের না হয় বিয়ে হয়ে সতী হয়ে গেছে, তুমি বাওয়া এত সাধুগিরি করছ কেন? নিজের ব্যাচেলার পার্টির ট্রিপটাতো শেষবারের মতো এনজয় করে নে হতভাগা আর তো সুযোগ পাবি না!” ফোঁস করে উঠল সৌরভ!

সমন্তক পাশ থেকে আমার হাতে চিমটি কেটে ইশারা করল, আমিও ছেড়ে দিলাম! সৌরভের বেগ যখন একবার উঠে গেছে, ওকে আটকালেও আর শুনবে না, বেফালতু মুখ খারাপ করবে! কে জানে শিল্পী মানুষগুলো বুঝি এরকমই অবুঝ হয়।

.

ওই দেখুন, আমাদের পরিচয়টাই দিতে ভুলে গেছি, আমি সাম্য, ব্যাংকে কর্মরত। পাশে আছে সমন্তক, বিদ্যুৎবিভাগে কর্মরত। আর সামনের সিটে আছে সৌরভ, সৌরভ নন্দী, বর্তমান সময়ের একজন প্রখ্যাত বেস্টসেলার লেখক।

উইক এন্ডে পুরুলিয়ার বরন্তীর দিকে চলেছি আমরা। এরকম উইক এন্ড ট্যুর প্রায়ই করে থাকি আমরা, আসলে দৈনন্দিন চলার পথগুলো এতটাই একঘেয়ে আর ক্লান্তিকর, যে মাঝেমধ্যে স্কুলের বন্ধুদের সাথে সেই সবুজ দিনগুলোয় ফিরে যাওয়াটা একান্ত বাধ্যতামূলক। এবারে অবশ্য অন্য একটা কারণও আছে, আমার বিয়ে সামনেই। পরশু সকালে, হঠাৎ এসে হাজির সৌরভ, আমি তখন সবে ব্যাংকের জন্য বাড়ি থেকে বেরোচ্ছি।

“আর সুযোগ হবে না, বেশি কথা বলবি না, এই উইক এন্ড বরন্তী, তোর ব্যাচেলার পার্টি দেব, আমি সমন্তককে জানিয়ে দিয়েছি।”

“মানে? আরে আগের থেকে তো বলতে হয়, আমি এখন কীভাবে কী ম্যানেজ করব?

“ওসব আমি জানি না, আমরা যাচ্ছি, ব্যস!” বেরিয়ে গেছিল সৌরভ!

ও চিরকালই এরকম, বড্ডো খামখেয়ালি, সেই স্কুলজীবন থেকেই! সেই ট্যুরেই বেরিয়ে পড়েছি আজ, দিল্লি রোড ধরে সোজা আসানসোল, সেখান থেকে পুরুলিয়ার দিকে বেঁকে, মুরাডি হয়ে বরন্তী, সেখানে দুদিন টানা খানাপিনা, এই হচ্ছে প্ল্যান!

“ভাই নতুন কিছু লিখছিস না? সমস্তক প্রশ্ন করল।”

“লিখছি তো!” সৌরভ বলল!

“বল না ভাই, হেব্বি বোরিং লাগছে রাস্তাটা!”

“বই বেরোবে, পয়সা দিয়ে কিনে পড়বি, ঠিক আছে?”

“আরে বেস্টসেলার হয়ে তো চামড়া খুব মোটা হয়ে গেছে রে তোর।”

“আসানসোল এলে ভালো করে কচুরি-টচুরি খাওয়া, তারপর ভেবে দেখছি!”

খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে ওঠে সৌরভ!

.

।। দুই।।

আসানসোল ছেড়ে বেশ কিছুদূর এগিয়ে গেছে আমাদের গাড়িটা।

“কী রে ভাই বল এবার, একটা জমিয়ে প্রেমের গল্প, বের কর দেখি তোর ব্রহ্মাস্ত্র।” সমন্তক আবার খোঁচায়।

“নাহ্, আজ প্রেম-ট্রেম না, একটা অন্যধরনের গল্প বলব, আর সেটা এই বরন্তী নিয়েই।”

“বেশ বল বল।” আমিও উৎসাহী হয়ে পড়ি!

“বরন্তীতে আমরা যে রিসোর্টে থাকব, সেটা একটা বিশাল লেকের ধারে। অ্যাকচুয়ালি এখানকার গোটা ট্যুরিজমটাই গড়ে উঠেছে এই লেকটাকে কেন্দ্র করে। বিকেলের সূর্যাস্ত, আর পূর্ণিমার রাতের চাঁদনি জোছনা, হ্রদের জলে পড়ে একদম ডিলা-গ্র্যান্ডি-মেফিস্টোফেলিস মার্কা দৃশ্য তুলে ধরে, আর সেটা দেখার জন্যই লোকে দূর দূরান্ত থেকে গাঁটের কড়ি খরচ করে আসে এখানে, আর লেকের জলটাও অদ্ভুত স্বচ্ছ!”

“বেশ, এ তো গেল আমাদের ডেস্টিনেশানের বর্ণনা, গল্প কই?” সমন্তক আবার খোঁচায়।

“দেখ গল্প বলার মাঝে ফের ডিস্টার্ব করবি তো আর কিছু বলবই না।”

“তুই থাম না শালা, খালি ফোড়ন, তুই ভাই বলতো ইগনোর হিম।” আমি বললাম!

“আর একবার ফোড়ন কাটবি তো, গল্প বন্ধ করে দিয়ে মাঝরাস্তায় নামিয়ে দিয়ে চলে যাব।”

“নাহ, ভাই আর কেউ ডিস্টার্ব করবে না, তুই শুরু কর।”

“হ্যাঁ যেটা বলছিলাম, তো হয়েছে কী, আগে বরন্তী লেকের চারপাশটা ঘন জঙ্গল ছিল, এখন এই ট্যুরিজমের জন্য হোটেল-টোটেল হয়ে কিঞ্চিৎ পরিষ্কার হয়েছে। আমি যে-সময়ের কথা বলছি, তখন এসব কিছুই ছিল না, লেকের চারিদিকে তখন ঘন জঙ্গল। লেকের পশ্চিমদিক বরাবর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে অনেকটা গেলে একটা ট্রাইবাল ভিলেজ পড়ত! টুলপা, ছবির মতো সাজানো-গোছানো ছোট্ট একটা গ্রাম, ট্রাইবাল ভিলেজ যেরকম হয় আর কী! তা গ্রামে সব কিছু ঠিকঠাক চলছিল, মেয়েরা ঘর-দোর সামলাচ্ছিল, আর পুরুষরা শিকার-চাষ ইত্যাদি! একদিন গ্রামে হঠাৎ একটা অদ্ভুত সমস্যা শুরু হল!”

“সমস্যা?”

“হুম! সমস্যা বলে সমস্যা! অনেকদিন ধরেই শুরু হয়েছিল গুঞ্জনটা! কিন্তু লজ্জার কারণে কেউ কাউকে বলতে পারেনি! কিন্তু আস্তে আস্তে এক কান, দু-কান হতে হতে সবাই দেখল সমস্যাটা বেশ কমন!”

“কীরকম সমস্যা ভাই? মহিলাঘটিত নাকি?” সমস্তক প্রশ্ন করল।

“হ্যাঁ মহিলাঘটিত তো বটেই, তবে কাইন্ড অফ এমবারেসিং, প্রতিটা মহিলার ক্ষেত্রেই!” মুচকি হেসে জানাল সৌরভ!

“কী কেস? আমি প্রশ্ন করলাম!”

“স্বামীদের সঙ্গে সংগমকালে মহিলারা খেয়াল করেছেন, ওদের স্বামীরা মাঝে মাঝেই নাকি অন্য কারও নামে শীৎকার দিচ্ছে!”

“মানে? এ তো ইন্ডিস্টিক ফট কেস পুরো!”

“ওয়েট বেরাদর ওয়েট! আসল শক তো এখনও বাকি!

এই অন্য কারও নামটা ছিল কমন একটা নাম!”

“বলিস কী?”

“ইয়েস, লজ্জার বাধা কাটিয়ে নিজেদের মধ্যে পুরো ব্যাপারটা আলোচনা করতে গিয়ে মহিলারা দেখেছিল, সবার স্বামীই একই নাম নিচ্ছে!”

“কী নাম?”

“মাসিন্দা!”

“সেটা আবার কে?”

“মাসিন্দা, ওই গ্রামেরই একটা মেয়ে, খুব ছোটো বয়সে বিধবা হয়ে গেছিল, দেখতে নাকি অপরূপ সুন্দরী ছিল! ব্যস আর কী, এই মহান ভারতবর্ষের গ্রাম বাংলায় বহু যুগ ধরে যা চলে এসেছে, তাই হয়েছিল! গুজব দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। ডাইনি সন্দেহে পুরো গ্রামের মেয়ে-ছেলে-বুড়ো মিলে মাসিন্দাকে পুড়িয়ে মারবে বলে তাড়া করেছিল! সে বেচারি জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে প্রাণের ভয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে ওই লেকের মধ্যে এসে পড়ে, ব্যস আর ওঠেনি!”

“তারপর?”

“তারপরই তো আসল ঘটনা শুরু, মাসিন্দা নিধনের পর সবাই যখন ভেবেছিল সব বোধহয় ঠিক হয়ে যাবে, তখনই শুরু হল অদ্ভুত এক মৃত্যুলীলা! মাঝেমধ্যেই গ্রাম থেকে পুরুষ আচমকা গায়েব হয়ে যেত!”

“ফুল ভ্যানিশ?”

“রাতের বিছানা থেকে আচমকা উধাও হয়ে যেত, পরের দিন খোঁজ খোঁজ! খোঁজ মিলত লেকের জলে, ফুলে থাকা মৃতদেহের আকারে!”

“কী সাংঘাতিক!”

“গ্রামের ওঝারা বিধান দিল, এসব মাসিন্দাদেবীর কাজ, মন্দির গড়ে পুজো দেওয়া হোক, তবে যদি শান্তি পেয়ে রেহাই দেয়!”

“ডাইনি থেকে থেকে ডাইরেক্ট দেবী?”

“ইয়েস বেরাদর, অচেনা অজানার প্রতি ভয় আর নিজেদের কৃতকর্মের প্রতি অপরাধবোধ থেকে মানুষ অনেক কিছুই করে থাকে।”

“পুজো দেওয়াতে মাসিন্দা দেবীর রোষ কমল?”

“রোষ কমল তো বটেই, শুধু তাই-ই নয়, মাসিন্দা দেবী উলটে বেশ পপুলার হয়ে উঠল গ্রামের ছেলেপুলের কাছে!”

“কীরকম?” সমস্তক প্রশ্ন করল।

“গ্রামে রটে গেছিল, মাসিন্দাদেবীকে তুষ্ট করতে পারলেই নাকি তিনি দর্শন দিচ্ছেন, শুধু তাই নয়, দর্শন দিচ্ছেন একদম পুজো নিবেদনকারীর আকাঙ্ক্ষিত প্রেয়সী রূপে!”

“মানে?”

“মানে আর কী, ছেলেপুলে হুলিয়ে মাসিন্দাদেবীর সাধনায় মেতে উঠেছিল কামের ফাঁদে পড়ে!”

“তাহলে তো ভালোই হয়েছিল, দেবীকে তুষ্ট করতে পারলেই তো কেল্লা ফতে!” অসভ্যের মতো খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে উঠল সমন্তক!

“অত সোজা নয় চাঁদু, এখানেই ছিল এই গল্পের ফাইনাল টুইস্টটা!”

“কী সেটা? আমি প্রশ্ন করলাম!”

“বাকিটা বরন্তীতে গিয়ে, আর কিচ্ছু আমি বলব না এখন, গলা শুকিয়ে কাঠ, আর আমাকে বকাস না!”

“আশ্চর্য ধরনের ছোটোলোক তো তুই!”

“দেখ কেমন লাগে!” এবারে, সমন্তকের কথায় অসভ্যের মতো খ্যাঁকখ্যাঁকিয়ে হেসে উঠল সৌরভ নিজে!

আমাদের গাড়িটা তখন মুরাডি হয়ে বরন্তীর দিকে টার্ন নিয়েছে!

.

।। তিন।।

যতই বারণ করা হোক, এই উইক এন্ড ট্যুরে এসে সমন্তক বড্ড বেসামাল হয় পড়ে। সহ্যের অতিরিক্ত পান করে, খানিকটা বাথরুমে উলটে, এখন বেহুঁশ হয়ে নাক ডাকাচ্ছে। ওকে বিছানায় ভালো করে শুইয়ে দিয়ে বেরিয়ে এলাম। দেখলাম সৌরভ বারান্দায় বসে আছে! রিসর্টের বারান্দাটা দারুণ, ছোটো টেবিল-চেয়ার রাখা আছে, সামনেই অল্প গাছ-গাছালির সীমানা পেরিয়ে দিগন্ত বিস্তৃত বরন্তী লেক! পূর্ণিমার চাঁদের প্রতিফলনে লেকের জলে অদ্ভুত একটা নৈসর্গিক দৃশ্যপট রচনা করেছে, নাহ্, সত্যিই সৌরভের টেস্ট আছে বলতে হবে, বেড়ে একখানা জায়গা চয়েস করেছে বটে! আমি এগিয়ে যেতেই সৌরভ একটা পাত্র আমার দিকে এগিয়ে দিল!

“তোর কী কেসটা বলতো?”

“কীসের কী কেস?” জড়ানো গলায় সৌরভ প্রশ্ন করল! “সবাই তো এবার সেটেল্ড হয়ে গেল, তোর খবর কী?”

“তুই হচ্ছিস হ না, আমাকে আবার জবাই হতে ডাকছিস কেন?”

“দেখ তোকে আমি সেই ছোটোবেলা থেকে চিনি, তুই না চাইলেও তোর ভালো-মন্দটা আমি দেখব।”

“বেশ তো দেখ না, বেফালতু ব্যাজর-ব্যাজর করে মৌতাতের বারোটা বাজাচ্ছিস কেন?”

“তুই কী ভাবিস আমি কিছু বুঝি না? বাড়ির থেকে আলাদা থাকিস! অফিসে যাস না, দিনরাত মদে ডুবে থাকিস! প্রতিটা গল্পের একই বিয়োগান্তক সমাপ্তি! তোর হাজার হাজার ফ্যান না বুঝলেও, আমি কিন্তু ঠিক বুঝতে পারি…”

“কী বুঝতে পারিস?” মুচকি হেসে বলে ওঠে সৌরভ!

“তুই এখনও দেবলীনাকে ভুলতে পারিসনি, সেই স্মৃতি আঁকড়েই বেঁচে আছিস! দেখ মিসহ্যাপ সবার জীবনেই ঘটে…”

“দুম করে একটা লাথি মেরে বারান্দা থেকে নীচে ফেলে দেব, আর সব উত্তর পেয়ে যাবি!” চিৎকার করে ওঠে সৌরভ!

“ভাই তুই ঠান্ডা মাথায় আমার কথাটা শোন, জীবনটাকে এইভাবে নষ্ট করিস না, এগিয়ে নিয়ে যা প্লিজ!”

“তুই তাহলে নষ্ট করছিস কেন?”

“আমি কী করলাম?”

“নাটক করো শালা আমার সাথে? আজ বাদে কাল বিয়ে করতে চলেছ একজনকে, আর এখনও মোবাইল খুললেই ফেসবুক-ইন্সটাগ্রামের সার্চ লিস্টে কার নাম আসে? খুলে দেখাব?”

“ওটা আলাদা ব্যাপার ভাই, কলেজের একতরফা প্রথম প্রেম, ও কি ভোলা যায়?” মৃদু হেসে আমি পরিস্থিত হালকা করতে চাইলাম!

“কোনোটাই আলাদা ব্যাপার নয় চাঁদু, আসলে কেউই আমরা ভুলতে পারি না, এক-একজন এক-একভাবে মনে রেখে দিই!”

“তাই হবে হয়তো!”

“তবে তোর তো সামনেই বিয়ে, কমপ্লিট দি এন্ড! তোকে একটা গিফট দেব ভাবছি।”

“কী গিফট্?”

“যদি তোর সর্বাণী আজ আসে তোর কাছে! একটা শেষ চাঁদনি রাতের জন্য!”

“নেশা হয়ে গেল নাকি? কী ভুলভাল বলছিস?” আমি ঝাঁজিয়ে উঠি!

“মাসিন্দা! দেবী মাসিন্দা!” চাঁদের আলো আঁধারিতে, পেয়ালা হাতে সৌরভের ওই অট্টহাসি, আমার বুকে অদ্ভুত একটা কাঁপুনি ধরাল!

.

।। চার।।

রুমের দরজাটা লাগিয়ে বিছানায় গিয়ে বসলাম। জানলা খোলা, হু-হু করে লেকের হাওয়া আসছে, ফুল স্পিডে ফ্যান চলছে, তবুও দরদর করে ঘামছি আমি। বিগত এক ঘন্টায় যে অদ্ভুতুড়ে কান্ডগুলো ঘটতে দেখলাম, সেগুলো একবার স্মৃতিচারণ করার চেষ্টা করলাম! নেশার ঘোরে, ঝোঁকের মাথায় মানুষ কীই না করে বসে, নিজেকে দিয়েই আজ প্রমাণ পেলাম। সৌরভের কথায় নেচে গিয়ে আজ যা একটা কাণ্ড করে বসেছি, লোকে শুনলে সোজা পাগলাগারদে পুরে দেবে।

আমাকে নিয়ে এই মাঝরাতে সৌরভ বেরিয়ে পড়েছিল রিসোর্ট ছেড়ে! অচেনা অজানা অন্ধকার পথে, জঙ্গল ভেদ করে, বুনো রাস্তা ধরে আমরা পৌঁছে গেছিলাম সেই জায়গায়, মাসিন্দাদেবীর মন্দিরে! প্রতি মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, এই বুঝি অন্ধকার বনের ভেতর থেকে কিছু একটা বেরিয়ে এসে ঘাড়ে ওপর লাফিয়ে না পড়ে! লতাপাতায় পা জড়িয়ে মনে হচ্ছিল, বিষধর সাপ, মুহূর্তের ভুল আর বোধহয় প্ৰাণটা গেল!

সেই মুহূর্তে মুখ দিয়ে গালাগাল ছাড়া আর কিছুই বেরচ্ছিল না, নেশা-টেশা সব উড়ে গেছিল, কী কুক্ষণে যে শালা সৌরভের কথায় নেচে উঠেছিলাম, নিজের গালে চড় মারতে ইচ্ছে করছিল! তবে সব থেকে অদ্ভুত ব্যাপার ঘটাচ্ছিল কিন্তু সৌরভ! যেন সে আগে বহুবার এসেছে, হাতের তালুর মতো চেনা, এমনভাবে হনহন করে সেই দুর্গম বুনো পথে হেঁটে চলছিল! অনেকটা পথে যাওয়ার পর, একটা বটগাছের তলায় পোড়ামাটির গুমটি মতো পড়ল!

“এইটা মন্দির? কিন্তু এর গায়ে যে গাছ-গাছালি গজিয়েছে, বহু বছর যে এদিকে কেউ পা-ও মাড়ায়নি বোঝাই যায়! তুই যে বললি ট্রাইবালদের মধ্যে বেশ পপুলার ছিল এই মন্দির?” আমি প্রশ্ন করেছিলাম!

ঠোঁটে আঙুল দিয়ে আমাকে চুপ করতে ইশারা করে, মন্দিরের সামনে বসতে বলেছিল সৌরভ! আমিও বসে পড়েছিলাম বিনা বাক্যব্যায়ে! আমাকে বসিয়ে রেখে মন্দিরের পেছনে উধাও হয়ে গেছিল সৌরভ!

ফিরে এসেছিল, হাতে চার-পাঁচটা অদ্ভুতদর্শন বুনো ফুল নিয়ে! আমি টর্চের আলোয় একদৃষ্টিতে দেখে চলছিলাম তার সেই অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা, মাসিন্দাদেবীর পুজোতে সৌরভ যে সিদ্ধহস্ত, এ-কথা বুঝতে আমার আর বাকি রইল না।

হাতব্যাগ থেকে একটা পাথরবাটি বের করে, তাতে ঢকঢক করে কিছু একটা তরল পদার্থ ঢালল, গন্ধের দাপটে বুঝতে পারলাম সেটা যে আমাদের আনা মদই! দুটো সিঁদুর মাখানো পাতিলেবু বের করে মন্দিরের চাতালে রাখল।

“দে আমাকে টর্চটা দে, আর তুই এখানে এসে বস, কিছু দেখতে পাচ্ছিস?”

সৌরভের টর্চের আলো মন্দিরের ভেতর গিয়ে পড়েছে, বহুবছরের ধুলো-ঝুল, গাছ-পাতার আড়ালে মন্দিরের মাঝে একটা সিঁদুর লেপা পাথর দেখতে পেলাম!

“ওই পাথরটাই কী?”

“হ্যাঁ, ওটাই মাসিন্দা! এবারে যেটা বলছি মন দিয়ে শোন, চোখ বন্ধ করে ফুল কনসেনট্রেশানে সর্বাণীর কথা ভাব, ঠিক যেমনটা করে তুই তাকে কাছে পেতে চাস। মনে রাখিস ভাবনায় ফাঁকি থাকলে কিন্তু এ পুজো কাজ করবে না! এর পরে পুজো সেরে আমরা যাবো বরন্তি লেকে, সেখানে চাঁদের আলো যেখানে পড়েছে, সেই জলে স্নান করতে হবে, তারপর বাড়ি ফিরে চুপটি করে শুয়ে পড়বি, মনে রাখিস দুনিয়া উলটে গেলেও তুই কিন্তু দরজা খুলে বেরোবি না!”

আমি বাধ্য ছাত্রের মতো মাথা নাড়ালাম!

সত্যি বলতে, ওই ঘন জঙ্গলের মাঝে, আলো-আঁধারিতে, গমগমে গলায় দুর্বোধ্য ভাষার মন্ত্র পড়ে চলা সৌরভকে যেন ঠিক মেলাতে পারছিলাম না আগের মতো!

.

।। পাঁচ।।

এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখ লেগে গেছিল কে জানে! ঘুম ভাঙল একটা দমকা বাতাসে। জানলার পাল্লাটা খুলে গেছে, হু হু করে হাওয়া ঢুকছে! বন্ধ করে ফিরে এসে শুতে যাব, হঠাৎ একটা তীব্র গন্ধ আমার নাকে এল! এ গন্ধ আমার অচেনা নয়, সেন্ট আর ঘামের গন্ধ মেশা একটা শরীরের গন্ধ এটা, ইঞ্জিনিয়ারিং-এর চার বছর ধরে এই গন্ধের আবেশে আবিষ্ট ছিলাম আমি! সামনের দিকে চোখ গেল, আর দেখতে পেলাম এক মুহূর্ত আগেও ফাঁকা পড়ে থাকা বিছানায় বসে আছে সর্বাণী!

হ্যাঁ আমার সর্বাণী!

স্লিভলেশ কালো টপ, জিন্‌স, চোখে মুখে দুষ্টু হাসি, ফর্সা চিবুকের বাম কোনায় ছোট্ট তিলটা, ঠিক কলেজের প্রথম দিনটা যেমন দেখেছিলাম! আমি বুঝতে পারছিলাম না কী করব!

এ কী সত্যিই সর্বাণী, নাকি মাসিন্দা, নাকি অতিরিক্ত নেশার কারণে হ্যালুসিনেশান?

সর্বাণী বিছানা থেকে উঠে একটু একটু করে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল! আবার সেই নস্টালজিক প্রিয় গন্ধটা, হায় ঈশ্বর! আমি না চাইতেও নিজেকে সঁপে দিলাম সর্বাণীর হাতে। এই দিনটার জন্য কত বছর ধরে যে আমি অপেক্ষা করে আছি! আমার একটা হাত ধরে সর্বাণী টেনে নিয়ে চলল দরজার দিকে, এ যেন নিশির ডাক, অমোঘ মায়ার টান, আমি এড়াতে পারলাম না! দরজা খুলে একটা একটা করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যেতে থাকলাম আমরা।

“সাম্য।”

হঠাৎ একটা প্রচণ্ড চিৎকারে আমার সম্বিৎ ফিরল। দেখলাম সৌরভ দৌড়ে দৌড়ে আসছে! “তোকে পই পই করে বলেছিলাম না শালা কোনোভাবেই দরজা খুলে বেরোবি না!”

আমার হুঁশ ফিরে এল। এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চাইলাম সর্বাণীর হাত থেকে। কিন্তু নাহ্, কী ভয়ংকর শক্তভাবে সে ধরে রেখেছে আমার হাতটা। আমি দাঁতে দাঁত চেপে আরও জোর লাগাতে গিয়ে দেখি, হা ঈশ্বর, সর্বাণী ভেবে এ কোন বিভীষিকার হাত আমি ধরে রেখেছিলাম! মানুষের শরীর অনেকদিন ধরে জলের তলায় চাপা পড়ে থাকলে যেমন হয়, ঠিক তেমনই একটা শ্যাওলা ধরা শরীর, কত নাম না-জানা জলজ উদ্ভিদ আর পোকামাকড় তার গায়ে কিলবিল করছে। আর কী প্রচণ্ড ঘৃণা সেই বিভীষিকার চোখদুটো জুড়ে। সৌরভ চিৎকার করতে করতে আমার দিকে দৌড়ে এল, তার হাতে ধরা একটা আয়না গোছের কিছু। এইবার দেখলাম সেই বিভীষিকার হাতের আগল একটু আলগা হল। সৌরভের হাতের আয়নাটার দিকে তাকাতে তাকাতে আমাদের দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টি হেনে অন্ধকারে একটু একটু করে মিলিয়ে গেল মাসিন্দা।

আমার আর দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা ছিল না। সৌরভ এসে জড়িয়ে না ধরলে আমি কাটা কলাগাছের মতো আছড়ে পড়তাম মাটিতে।

“চল তোকে শুইয়ে দিয়ে আসি সমন্তকের পাশে, আজ আর একা শুতে হবে না! আমি বাইরে বসে পাহারা দিচ্ছি, আমাকে নিয়ে ভয় পাস না, মাসিন্দাদেবীর গলি আমার কাছে নতুন নয়!”

“তুই বসে থাকবি?” আমি মৃদু স্বরে প্রশ্ন করলাম!

“সেদিনের সেই গল্পটার আসল টুইস্ট ছিল এটাই রে, আমি ইচ্ছে করেই বলিনি, যাতে ভয় না পাস! ভক্তের পুজোয় সন্তুষ্ট হলে মাসিন্দা ভক্তকে দর্শন দিয়ে তুষ্ট করত বটেই, কিন্তু বিনিময়ে পুজোর নৈবেদ্য হিসেবে ভক্তের প্রাণ কেড়ে নিত ছলনায়। খুব কম জনই পেরেছে মাসিন্দার ছলনা থেকে বেরিয়ে আসতে!”

“আর তুই তাদের মধ্যে একজন তাই তো?”

“আজ আর কথা নয়, তোর ওপর অনেক ধকল গেছে, শুয়ে পড়, কাল কথা হবে এ নিয়ে কেমন!”

আমিও আর কথা বাড়ালাম না, শরীর দিচ্ছিল না, কিন্তু কাল ঠিক এর সব হিসেব তুলব সৌরভের কাছ থেকে।

.

।। ছয় ।।

মুখে সূর্যের আলোটা এসে পড়তেই ঘুমটা ভেঙে গেল, ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। উফ, মাথাটা অসম্ভব ভারী হয়ে আছে, নাহ্ আর এত মদ খাচ্ছি না, ঢের শিক্ষা হয়েছে। পাশে দেখলাম সমন্তক তখনও বেহুঁশে ঘুমোচ্ছে। ধীরে ধীরে রাতের সব ঘটনাগুলো একটু একটু করে মনে পড়তে লাগল।

চোখে-মুখে ভালো করে জল দিয়ে, বাথরুমের বড়ো আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আচ্ছা আগের রাতের ঘটনাগুলো সব স্বপ্ন নয়তো? কিন্তু তাহলে বুকের ওপর এই সদ্য কাটা আঁচড়ের দাগগুলো কীসের? হালকা একটা জামা গলিয়ে নিলাম, সৌরভকে দরকার ইমিডিয়েটলি।

“সৌরভ, সৌরভ!” চিৎকার করতে করতে আমি পাশের রুমে গিয়ে ঢুকলাম। কী আশ্চর্য, দরজা তো এমনিই খোলা, সৌরভ নেই! কীরকম ইরেসপন্সিবল ছেলে ভাবো, এরকম একটা ট্যুরিস্ট-প্লেসে ঘর খুলে রেখে কোথায় চলে গেছে!

আমি ফোন লাগালাম, ফোনটা বাজছে, কিন্তু সেটা ঘরের মধ্যেই। ড্রেসিং টেবিলের ওপর পড়ে আছে সৌরভের ফোনটা। আমি গিয়ে ধরলাম ফোনটা। তার তলায় একটা কাগজের চিরকুট চাপা পড়ে আছে।

ভাই সাম্য,

ছোটো থেকে অনেক আমার অনেক অন্যায় আবদার মেনেছিস, এই শেষ একটা অন্যায় মেনে নিস। কাল তুই ঘুমিয়ে পড়ার পর মাসিন্দা আবার এসেছিল জানিস। নাহ্ প্রতিবারের মতো দেবলীনার রূপে নয়, বরং তার নিজের আসল রূপে, এক স্বজন হারানো যন্ত্রণাক্লিষ্ট কিশোরীর। আসলে কাল প্রথমবার তার চোখ দুটো ভালো করে দেখেছিলাম, দেখলাম আমার মতোই উদ্দেশ্য খোঁজা একটা নিঃসঙ্গতা সে চোখদুটো জুড়ে। তাই তোকে বারণ করলেও আমি নিজেই চললাম ভাই, মাসিন্দার সাথে। দুঃখ করিস না, জানবি আমার ফেরার জন্য কোনো কারণই আর অবশিষ্ট ছিল না, আই অ্যাম ফাইনালি ডান হিয়ার ব্রাদার।

ভালো থাকিস।

ইতি, সৌরভ।

কাগজের টুকরোটা হাতের মুঠোয় ধরে আমি পাগলের মতো দৌড় লাগালাম, রিসর্টের মেইন গেটের দিকে! আমার চোখে তখন লেকের জলে ফুলে থাকা একটা লাশের ছবি ভেসে উঠেছে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here