রাতপরি
“তাহলে চার্লস আমি এখন আসি, একদম মন খারাপ করবে না কিন্তু, আমি আবার আসব। দাদু-দিদিমার সব কথা শুনবে কেমন, একদম দুষ্টুমি করবে না, আর দিদিকেও কিন্তু তোমাকেই নজরে রাখতে হবে, পারবে তো?”
নীরবে মাথা নাড়ে ছোট্ট চার্লস। তার আর দিদির কপালে স্নেহচুম্বন দিয়ে, গাড়িতে করে হুস করে বেরিয়ে যান ক্যাথি, তাদের মা। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা বেয়ে দ্রুতগতিতে নেমে চলা কালো গাড়িটার দিকে চেয়ে থাকে চার্লস, সেটা ক্রমশ ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে যায়।
.
“স্যার, আপনার কলেজ এসে গেছে।” ড্রাইভারের ডাকে ধড়ফড় করে উঠে বসেন চার্লস। প্রফেসর চার্লস স্মিথ, স্বনামধন্য প্রাণীবিদ্যার অধ্যাপক। মাত্র বত্রিশ বছর বয়সেই চার-চারটে কলেজ ঘোরা হয়ে গেছে তাঁর। আজ ইউনিভার্সিটি অফ ওহায়ো-তে যোগ দেওয়ার পালা।
গাড়ি থেকে নেমে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে চারপাশটা দেখতে থাকেন চার্লস। এখানে কি তিনি সেই জিনিসটার সন্ধান পাবেন, যার সন্ধানে তিনি প্রায় গোটা আমেরিকা চষে বেড়িয়েছেন, কে জানে!
“সুপ্রভাত, আপনি কি মিঃ চার্লস? আমার নাম মরিস, প্রিন্সিপ্যাল স্যার আমাকে পাঠিয়েছেন।”
“হ্যাঁ আমিই চার্লস, আসলে আরও দুদিন আগে আসার কথা ছিল, কিন্তু একটা সমস্যার জন্য দেরি হয়ে গেল।”
“ওটা কোনো ব্যাপার না, আপনার চিঠি আমরা পেয়েছি। আপনার মতো একজন বড়ো মাপের মানুষ এখানে পড়াতে রাজি হয়েছেন, এটা আমাদের কাছে খুবই গর্বের একটা ব্যাপার।”
অযথা নিজের গুণগান শোনা কোনোদিনই চার্লসের পছন্দ নয়, তিনি চুপ করে মরিসকে অনুসরণ করতে থাকেন প্রিন্সিপ্যালের ঘরের দিকে…।
.
।। দুই।।
কলেজের কাছেই একখানা ঘর পাওয়া গেল। প্রিন্সিপ্যাল লোকটা ভালো, সব গুছিয়ে নেওয়ার জন্য আরও একদিন সময় দিয়েছেন। চার্লস ব্যাচেলর মানুষ, ফলে গোছানোর বলতে সেরকম কিছুই নেই তাঁর, কিছু বই আর কটা কাচের বোতল ছাড়া। ট্র্যঙ্ক থেকে একটার পর একটা জিনিস বের করে ওয়াল আলমারিতে সাজিয়ে রাখতে লাগলেন তিনি।
আসলে প্রাণীবিদ্যার অধ্যাপক হলেও তাঁর আসল ভালোবাসা ক্রিপ্টোজুলোজি। যে সমস্ত প্রাণীরা শুধুমাত্র প্রমাণের অভাবে হারিয়ে গেছে এ-পৃথিবী থেকে, লোকগাথা ছাড়া আর তাদের আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না, যেমন ইয়েতি কিংবা বিগ ফুট, পরি, জলদানো আরও কত কী। আর ঠিক সেটার জন্যই তাঁর এখানে আসা।
শুধু এখানে নয়, আগের চার-চারটে কলেজও তাঁর ঘোরা হয়ে গেছে ওই একটা কারণেই, কিন্তু কোথাও সেরকম কিছু সূত্র তিনি পাননি, কাচের বোতলগুলো সাজাতে- সাজাতে ভাবছিলেন চার্লস। অথচ এই কলেজে আসার কোনো কথাই কিন্তু ছিল না, চাকরিটা তো বাহানা মাত্র। এই কলেজেরই এক প্রাণীবিদ প্রফেসর স্যামুয়েলের এক রিসার্চ পেপার তাঁর নজর কেড়েছিল, চিঠিতে যোগাযোগও করেছিলেন চার্লস, কথা-বার্তাও বেশ অনেকটা এগিয়েছিল। কথায় কথায় স্যামুয়েল চার্লসকে জানিয়েছিলেন যে এখানে এলে তিনি তাকে কিছু অদ্ভুত জিনিস দেখাবেন, যেটা তিনি তাঁর দীর্ঘ ৮ বছরের ক্রিপ্টোজ্বলোজির চর্চায় কল্পনাও করতে পারবেন না।
কিন্তু বিধি বাম, কদিন চিঠির উত্তর আর না পেয়ে খোঁজ নিয়ে চার্লস জানতে পারেন খুব অদ্ভুতভাবে হঠাৎ করে নিখোঁজ হয়েছেন স্যামুয়েল। তাই শুধু স্যামুয়েলের বাকি রিসার্চ ওয়ার্ক দেখাই নয়, তাঁর আচমকা অন্তর্ধানটাও চার্লসের এখানে আসার অন্যতম কারণ, সত্যি বলতে কী, এই অন্তর্ধানগুলো তাঁর জীবনে নতুন নয় খুব একটা।
নাহ্, রাত বেশ গভীর হল। গোছানোর কাজও প্রায় শেষ, এবারে শুয়ে পড়তে হবে। স্টাডি রুমের আলোটা বন্ধ করে বেডরুমের দিকে এগিয়ে যান চার্লস…
“আচ্ছা দিদি, তোকে কতবার না সবাই বারণ করেছে, এখানে আসতে, দুষ্টু পরিরা একদিন তোকে ঠিক তুলে নিয়ে যাবে দেখিস।”
“ধুর বোকা, ওটা তো বড়োরা আমাদের ভয় দেখানোর জন্য বলে। যাতে আমরা এদিকে না আসি, ওইসব বাদ দে। এখন চল ওই টিলাটার পেছনে একগাদা ব্লু-বেরির গাছ রয়েছে, দারুণ খেতে।”
“আমি যাব না। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, দাদু বকবে আর তোকেও যেতে দেব না।”
“হাঁদারাম একটা, তুই না গেলে আমি একাই যাব।”
“আমি তাহলে দাদুকে নালিশ করে দিয়ে আসব।”
“তুই দাদুকে নিয়ে আসার আগেই আমি দৌড়ে বাড়ি পৌঁছে যাব দেখিস।”
“দিদি ওইটা কী রে ওই যে ওই টিলাটার ডানদিকে দাঁড়িয়ে, ওই ডানাওয়ালা লম্বা লম্বা পা!”
“বড়োদিদিকে ভয় দেখান হচ্ছে শয়তান ছেলে।”
“না রে সত্যি কী যেন একটা দেখলাম, আমার কেমন একটা লাগছে। তুই ফিরে চল লক্ষীটি। কী রে তুই আবার কোথায় গেলি? দেখ আমার কিন্তু ভয় লাগছে, এরকম সময় লুকোচুরি খেলার কোনো মানে হয়? দিদি দিদিইইইই….।”
.
অ্যালার্ম ক্লকের জোরালো আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায় চার্লসের, উঠে বসেন ধড়ফড় করে। উফফ্ সেই দুঃস্বপ্নটা আবার দেখছিলেন তিনি, আজ গত ২৩ বছর ধরে এক জিনিস দেখে চলেছেন, কবে যে এর হাত থেকে মুক্তি পাবেন, কে জানে…
.
।। তিন।।
“স্যার আসতে পারি?”
“কে?”
“আমি মার্থা, সেকেন্ড ইয়ার সায়েন্স, আপনার সাথে একটু কথা ছিল।”
“আমি তো তোমাদের ক্লাস কোনোদিন নিইনি।”
“ক্লাসের ব্যাপারে নয়, প্রফেসর স্যামুয়েলের ব্যাপারে কিছু কথা ছিল আপনার সাথে।”
স্যামুয়েল, স্যামুয়েল জোন্স, সারা শরীর জুড়ে যেন একটা বিদ্যুৎ প্রবাহ বয়ে যায় চার্লসের। গত একমাস ধরে এই একটা লোকের ব্যাপারেই তো হন্যে হয়ে খুঁজে চলেছেন চার্লস, কেউ সদুত্তর দিতে পারেননি, না ছাত্র আর না কলেজ ম্যানেজমেন্ট। প্রশ্ন করলেই শুনেছেন, লোকটা বিদ্বান হলেও পাগল প্রকৃতির ছিলেন, ক্লাস-টাসও মন দিয়ে করতেন না শেষের দিকে, মাঝেমধ্যেই উধাও হয়ে যেতেন, আবার ফিরেও আসতেন। আসলে দীর্ঘ ২২ বছর এই কলেজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাই শুধু সম্মানের খাতিরেই কেউ কিছু আর বলত না ওনাকে, নিজের মতো করে থাকতেন আর দিন রাত কী নিয়ে জানি রিসার্চ করতেন।
“ভেতরে এসো।” সম্মতি দিলেন চার্লস, আসলে ক্লাস শেষ হয়ে যাওয়ার পর বিকেলের দিকে এই কিছুটা সময় ওনার একদম ব্যক্তিগত, নিজের মতো করে লাইব্রেরিতে বই নিয়ে উলটান, বাইরে থেকে কেউ ওনাকে বিরক্ত করে, এটা ওনার পছন্দ নয়, কিন্তু আজ ব্যাপারটা একদম আলাদা।
“ওনার ব্যাপারে তোমার কী বলার থাকতে পারে? টুকটাক রিসার্চ পেপার বাদে আর যাকেই কিছু প্রশ্ন করেছি, শুনেছি পুলিশ ওনার সব কিছু তুলে নিয়ে ঘর সিল করে দিয়েছে তদন্তের স্বার্থে।”
“আসলে আপনার মতোই আমিও ক্রিপ্টোজুলোজি নিয়ে খুব উৎসাহিত ছিলাম, আর ঠিক সেই কারণেই বোধহয় প্রফেসর আমাকে কিছুটা স্নেহ করতেন।”
“বুঝলাম, তা প্রফেসর কোথায় গেছেন কিছু বলেছেন তোমাকে?”
“নাহ্, উনি নিজের কাজের ব্যাপারে বিশেষ কিছুই বলতেন না, তবে উনি একটা জিনিস দিয়ে গেছিলেন আপনার জন্য।”
“আমার জন্য? তো আমি যখন এতদিন হন্যে হয়ে খুঁজছি, তুমি এসে কিছু জানাওনি কেন?”
“প্রফেসরের দেওয়া আমাকে শেষ নির্দেশ ছিল এটাই। যদি আমি দুমাসের মধ্যে না ফিরি। এটা প্রফেসর চার্লস বলে একজন এই কলেজে আসবেন, ওনাকে দিয়ে দিয়ো।”
“বেশ এটা আমি নিলাম, তুমি এখন আসতে পারো।” মার্থা চলে গেল। চার্লস সব গুছিয়ে উঠে পড়লেন। তাঁর মনে এখন চিন্তার ঝড়। স্যামুয়েল কী রেখে গেছেন তাঁর জন্য বাক্সটায়? কী থাকতে পারে? যার জন্য একটা মানুষকে হারিয়ে যেতে হয়…
.
।। চার।।
ডিয়ার চার্লস,
তুমি যখন এখানে আসবে, আমি হয়তো আর থাকব না এই পৃথিবীতে। অনেক কিছু তোমাকে বলার ছিল, দেখানোর ছিল, কিন্তু বোধহয় তার সময় আমি আর পাব না। প্রতিমুহূর্তে ওরা আমাকে নজরবন্দি করে রেখেছে, তাই সবার চোখ এড়িয়ে এই চিঠি আর একটা বাক্স মার্থাকে দিয়ে গেলাম, ও তোমাকে দিয়ে দেবে, ওকে আমি বিশ্বাস করি। তারপরে তুমি যা ভালো বুঝবে করো।
ভালো থেকো বন্ধু,
স্যামুয়েল
.
“আর কিছুই লেখা নেই?”
মার্থার এই অযাচিত প্রশ্নে বিরক্ত হয় চার্লস। স্যামুয়েলের বাক্স রহস্য উদ্ঘাটনের সময় শুধুমাত্র ভদ্রতার খাতিরে তাকে ডেকেছিলেন চার্লস।
“থাকলে তো তুমি শুনতেই পেতে, তাই না?”
“মাফ করবেন, আসলে প্রফেসর স্যামুয়েল আমার খুবই কাছের একজন মানুষ ছিলেন, তাই আমি কিছুটা বোধহয় অতিরিক্ত উৎসাহ দেখিয়ে ফেলেছি।”
“তুমি বলতে চাও যে এই চিঠি বা বাক্স তুমি কিছুই আগে খুলে দেখনি?”
“দেখুন মিঃ চার্লস আপনি কোনো কারণে বোধহয় আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। কিন্তু আপনার জেনে রাখা ভালো মিঃ স্যামুয়েলকে আমি খুবই শ্রদ্ধা করতাম। ওনার বিশ্বাসের অমর্যাদা হয় এরকম কোনো কাজের কথা আমি ভাবতেও পারি না।”
“বুঝলাম, তাহলে দেখা যাক উনি আমাদের জন্য বাক্সে কী রেখে গেছেন। আরে এটা কী? এটা তো আমি চিনি।” বাক্সটা খুলতেই চিৎকার করে উঠলেন চার্লস। এক ছুটে চলে গেলেন ঘরের ভেতরে।
ফিরে এলেন হাতে একটা বাক্স নিয়ে, তাঁর আর স্যামুয়েলের বাস্কটাকে পাশপাশি রাখলেন।
মার্থা উঁকি মেরে দেখল, দুটো বাক্সেই দুটো পাতলা প্লাস্টিকের মতো জিনিস রাখা, অনেকটা ফড়িঙের পাখনার মতো। তবে সাইজে অনেকটাই বড়ো।
“আমি জানতাম, আমি ভুল নই, ওরা আছে, আর ওরাই সেদিন দিদিকে তুলে নিয়ে গেছিল। আমাকে সবাই পাগল মনে করে। কিন্তু আমি সবাইকে এবার প্রমাণ করে দেব।” নিজের মনে বিড়বিড় করতে থাকেন চার্লস, উত্তেজনায় কাঁপতে থাকেন তিনি, এই বুঝি পড়ে যাবেন। মার্থা উঠে পড়ে, সে বুঝতে পারে না কী করবে, শেষমেশ বাচ্চাদের মতো করে চেপে জড়িয়ে ধরে চার্লসকে।
.
।। পাঁচ।।
ফায়ার প্লেসের আগুনটা দাউদাউ করে জ্বলছে। একটা গাউন কোনোক্রমে গায়ে চাপিয়ে সেই আগুনের ওম নিতে দেখা যায় চার্লসকে। নিবিড় চিত্তে কী একটা যেন ভেবে চলেছেন। কম দিন তো হল না, তিনি তাঁর সমস্ত শরীর মন সব সঁপে দিয়েও বিনিময়ে কিচ্ছু পাননি। এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে ছুটে গেছেন, রাতের পর রাত কাটিয়েছেন জঙ্গলে-জঙ্গলে, পাহাড়-টিলা-গুহা কিচ্ছু বাকি রাখেননি। যেখানে যে ডেকেছে, একটু সূত্রের জন্য ছুটে গেছেন। কিন্তু নাহ্, তারা বোধহয় আর তাঁকে আর দেখে দেবে না, তাই একটা প্রমাণ পাওয়া তো দূরের কথা, পাগল বদনাম ছাড়া তাঁর আর কিচ্ছু জোটেনি।
উঠে যান চার্লস, ফিরে আসেন নিজের আর স্যামুয়েলের বাক্সটাকে নিয়ে, খুলে দেখতে থাকেন ডানা দুটো। স্যামুয়েলের ডাকে যখন এখানে এসেছিলেন, ভেবেছিলেন এখানে অন্তত একটা নতুন কিছু পাবেন। কিন্তু নাহ্, তিন মাস কেটে গেছে, কিছুই খুঁজতে বাকি রাখেননি তিনি, সেটা স্যামুয়েলের সিল করা বন্ধ ঘর হোক, কিংবা পুলিশের বাজেয়াপ্ত করা জিনিস। একরাশ অপ্রয়োজনীয় জঞ্জাল ছাড়া অদ্ভুতভাবে বাকি সব যেন উবে গেছে।
চরম হতাশায় বিরক্ত হয়ে বাক্স দুটোকে সশব্দে ছুড়ে ফেলেন চার্লস।
“আবার আপনি পাগলামি করছেন, আপনাকে না বলেছি অতীতে আর ফিরে তাকাবেন না!” পেছন দিক থেকে একটা অনাবৃতা নারী শরীর এসে জড়িয়ে ধরে চার্লসকে। অবোধ শিশুর মতো নিজেকে আত্মসমর্পণ করেন চার্লস সেই নারীর শীতল বুকে, সমস্ত জ্বালা-যন্ত্রণা তাঁর জুড়িয়ে যায়, মাথায় দপদপ করতে থাকা শিরাগুলো শান্ত হয়ে আসে।
“নাহ্ তুমি ঠিক বলেছ, অতীত নিয়ে বাঁচা যায় না। কম চেষ্টা তো আমি করিনি, কিন্তু আর না, এবারে কোথাও একটা একটা দাঁড়ি টানতেই হবে বোধহয়।”
“তাহলে আসুন আবার মিশে যাই বর্তমানে।”
“তুমি যাও আমি আসছি, একটা শেষ কাজ বাকি, মুচকি হাসেন চার্লস। প্রাণীবিদ্যা আর ক্রিপ্টোজ্বলোজি ছাড়াও যে আর একটা জগৎ আছে সেটা তিনি প্রায় ভুলতে বসেছিলেন, স্যামুয়েলকে ধন্যবাদ, তাঁর ডাকে এখানে আসাটা একদম ব্যর্থ হয়নি বলে, তাঁর ৩২ বছর জীবনে প্রথমবার সেই অনাবিল আনন্দের স্বাদটার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। শুরুর ওই একটা রাতই তাঁর জীবন বদলে দিয়েছে চিরতরে, এখন তিনি মুক্ত সমস্ত রকম দুঃস্বপ্ন থেকে।”
বাক্স দুটো খুলে দুটো ডানা বের করে আনেন তিনি, তারপর ছুড়ে দেন ফায়ার প্লেসের মধ্যে, বিশ্রী একটা গন্ধে ঘরটা ভরে যায়।
তিনি জানেন তিনি কোনোদিনই ভুলতে পারবেন না সেই ছায়ামানবদের কথা, যেমন ভুলতে পারবেন না ছোটোবেলায় তাঁর পাশ থেকে হারিয়ে যাওয়া দিদির কথা, কিন্তু আপাতত আর না, জীবনটা একটু অন্যভাবে চালানো যাক, ভবিষ্যতে কোনোসময় কোনো সূত্র পেলে আবার না হয় দেখা যাবে। চার্লস এগিয়ে যান বিছানার দিকে। যেখানে আদুল গায়ে শুয়ে আছে এক নারী। আবছা নীলচে আলোয় যার শরীরের গোপন বিভাজিকাগুলো হাতছানি দিয়ে তাঁকে ক্রমাগত ডেকে চলেছে।
ক্রমে আলো আরও কমে আসে। সৃষ্টির এক অমোঘ নিয়মে দুটো ঘর্মাক্ত শরীর ওঠা নামা করতে থাকে, একটা চার্লসের আর একটা তাঁর প্রেয়সী মার্থার…।
.
।। ছয় ।।
“উফফ্ টানা চার ঘণ্টা গাড়িতে বসে থাকা যায়? এতদূরে তোমার বাবা-মা বাড়ি করতে গেলেন কোন দুঃখে?”
“আপনি শুধু রাস্তাটাই দেখলেন, আর জায়গাটার ব্যাপারে কিছু বলুন। কেমন লাগছে?”
নাহ্, জায়গাটা কিন্তু খাসা, ভাবছিলেন চার্লস।
মার্থার আবদার, তার মা-বাবার সাথে দেখা করতে যেতে হবে। কলেজ থেকে সাতদিনের ছুটি নিয়ে তাই বেরিয়ে পড়েছেন। বিবাহের কথাও হবে আর প্রি-হনিমুনও, কারণ কলেজ কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে সেই কলেজেরই ছাত্রীর সাথে প্রফেসরের প্রেম, ব্যাপারটা একেবারেই সহজ নয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বেশ উঁচু মার্থাদের গ্রামটা। ‘একটা পাহাড়ের কোলে ছোট্ট সুন্দর একফালি গ্রাম, ২০-২৫ টা বাড়ি বড়োজোর, শহুরে সভ্যতার থাবা এড়িয়ে ছবির মতো সুন্দর একটা গ্রাম।
“মার্থা, তোমাদের গ্রামটা সত্যিই সুন্দর, এখানেই ঘরজামাই হয়ে থেকে যেতে আমার আপত্তি নেই।” মুচকি হাসলেন চার্লস
“গ্রামের লোকের তো থাকতে পারে।” খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে মার্থা।
“তবে রে দুষ্টু মেয়ে!” বলে কপট রাগে জড়িয়ে ধরলেন চার্লস মার্থারকে।
সারাটা দিন খুব আনন্দে কাটল, প্রফেসরের বিবাহ প্রস্তাবে মার্থার বাবা-মা যেন হাতে চাঁদ পেলেন, দারুণ মজার লোক ওরা। শুধু ওরাই নন, গ্রামের প্রত্যেকটা মানুষই। সবাই এসে দেখা করে গেল প্রফেসর-এর সাথে। রীতিমতো চাঁদের হাট, খানাপিনা, গান-গিটার সমস্তটাই
প্রফেসর-এর সম্মানে…
.
।। সাত ।।
খোলা আকশের নীচে একফালি কাপড়ের ওপরে শুয়ে আছেন চার্লস আর মার্থা। একমাত্র চাঁদ ছাড়া আর কেউ সাক্ষী নেই আশেপাশে। পাশে একটা বিশাল দিঘি, তার জলে চাঁদের আলো খেলে যাচ্ছে আর তাদের চারিদিক ঘিরে রয়েছে এক ঘন জঙ্গল। কত নাম না-জানা গাছের সারি। তারা যেন সভ্যতার আলো থেকে বিচ্ছিন্ন দুই মানব- মানবী, ঠিক আদম ও ইভ-এর মতো।
“আপনি সাঁতার জানেন?”
“তা জানি, কিন্তু তুমি এই রাতে জলে নামবে নাকি?”
“নামলেই বা ক্ষতি কী, ডুবে গেলে আপনি তো আছেন, বাঁচিয়ে দেবেন।”
শরীর থেকে একটার পর একটা পোশাক খসে পড়তে থাকে মার্থার, ধীর পায়ে সে এগিয়ে যায় দিঘির দিকে, ক্রমশ তার নিরাভরণ শরীরটা ডুবে যেতে থাকে দিঘির জলে।
মুগ্ধ দৃষ্টিতে চার্লস দেখতে থাকেন তার এই জলকেলিকে, আর ভাবতে থাকেন মিথ্যা স্বপ্নের পেছনে দৌড়ে তিনি প্রকৃতির কত সুন্দর একটা দিক মিস করে যাচ্ছিলেন।
কিন্তু হঠাৎ করে জলের আওয়াজ আসা বন্ধ হয়ে যায়, উঠে পড়েন চার্লস। কই মার্থাকে তো আর দেখা যাচ্ছে না! তিনি চিৎকার করে ডাকতে লাগলেন “মার্থা… মার্থা…” কিন্তু নাহ্, তাঁর চিৎকারের প্রতিধ্বনি ছাড়া আর কোনো সদুত্তর ভেসে আসে না। একটা বহু পুরোনো স্মৃতি, অজানা আশঙ্কা, তবে কি মার্থাকেও ওরা… শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমেল স্রোত নেমে যায় তাঁর।
“তুমি আমাকে খুঁজছ চার্লস?”
“এরকম ছেলেমানুষির কোনো মানে হয়, দাঁড়াও তোমার বাবাকে বলে বকুনি খাওয়াব।”
“এদিকে এসো চার্লস, তোমাকে একটা জিনিস দেখাই।”
“তোমার কোন জিনিসটা আর আমার দেখা বাকি প্রিয়তমা…?” কথাটা শেষ করতে পারলেন না চার্লস, চিৎকার করে ছিটকে পড়লেন, মার্থা দাঁড়িয়ে আছে উলটো দিকে মুখ করে, তার উন্মুক্ত পিঠে পড়ছে চাঁদের আলো, আর তাতে যে জিনিসটা চকচক করে উঠছে, সেটা হল একজোড়া ডানা, ঠিক স্যামুয়েলের বাক্সের মতোই। ডানাগুলো মৃদু নড়ছে, আর তার থেকে ফরফর করে একটা শব্দও আসছে।
দিগ্বিদিক জ্ঞ্যন শূন্য হয়ে দৌড়াতে লাগলেন চার্লস I কতবার হোঁচট খেলেন, কত জায়গা ছড়ে গেল ঠিক নেই। হাতড়ে হাতড়ে মনে হল এইবার গ্রামের রাস্তাটার মুখে এসে গেছেন ঠিক আর ভয় নেই… কিন্তু ওটা কী, ওরা কারা? রাস্তার মুখ জুড়ে দাঁড়িয়ে এক গাদা মানুষ, ওই তো মার্থার মা-বাবা, ওই তো বৃদ্ধ জোসেফ, শেরিফ মরগ্যান, কিন্তু সবাই উলঙ্গ, আর দূর থেকে তাদের গা থেকে একটা ফরফর শব্দ ভেসে আসছে। আর মাথা ঠিক রাখতে পারলেন না চার্লস। তিনি জ্ঞান হারালেন।
“তুমি মিছেই ভয় পাচ্ছিলে চার্লস।” হিসহিসে একটা গলার স্বরে সম্বিৎ ফিরে আসে চার্লসের, দেখলেন সামনে মাটি থেকে অন্তত তিন ফুট উঁচুতে উড়ছে মার্থা। নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলেন তিনি, কিন্তু নাহ্ পারলেন না। একটা বাজ পড়ে ঝলসে যাওয়া গাছের তলায়, তার শিকড়বাকড়ে জড়িয়ে আছেন তিনি।
“আমি কিন্তু তোমাকে সত্যিকারের ভালোবেসেছিলাম মার্থা।” ফুঁপিয়ে ওঠেন চার্লস।
“জানি তো চার্লস, তাই তো তোমাকে অমরত্ব প্রদান করব। চারপাশটা ভালো করে দেখো চার্লস, দেখো এরা কত সুখী।”
ঘাড় বেঁকিয়ে চারিদিকটা দেখতে চেষ্টা করলেন চার্লস। আরে এই গাছগুলো তো একটু আগেও কত দূরে ছিল আর এখন গায়ের কত কাছে। প্রতিটা গাছের মাঝখানে যেন মিশে আছে একটা করে মানবশরীর, তার থেকেই যেন নতুন করে বেরিয়েছে শাখা-প্রশাখা।
“দেখেছ চার্লস এরা তোমাকে অভিনন্দন জানাতে এসেছে। এই সবুজ, এই জঙ্গল, এই গাছগুলো না বাঁচলে আমরা কেউ বাঁচতে পারব না, তাই আত্মবলিদান প্রয়োজন চার্লস।”
“আমাকে ছেড়ে দাও মার্থা। আমি আর এইসব নিয়ে ঘাঁটব না। কাউকে কিছু বলব না। দূরে চলে যাব।”
“তুমি আবার ভুল করলে চার্লস, যারা আমাদের ভালোবাসে, কাছে চায় আমরা একমাত্র তাদেরই দেখা দিই, তুমি বলেছিলে না তুমি আমার এই সুন্দর শরীরটার সাথে মিশে যেতে চাও, চোখ তুলে দেখো চার্লস আমার সব থেকে প্রিয় গাছটা তোমার জন্য বেছেছি, এর পরে প্রতি রাতে আমারা আবার আগের মতো মিলিত হব, কোনো সমাজ-কলেজ-প্রিন্সিপাল কেউ আর আমাদের আটকাতে পারবে না।”
বাজ পড়া গাছটার একটা মোটা কাণ্ড ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকে চার্লসের দিক। মার্থার খিলখিলিয়ে হাসি আর চার্লসের বুকভাঙা আর্তনাদে রাতের নীরবতা খান খান হতে থাকে। কিছুক্ষণ পর সব শান্ত হয়ে আসে, শুধু শোনা যেতে থাকে একটানা একঘেয়ে একটা ফরফর শব্দ…







