মায়াবী মায়ং
“মায়ং! ইন্ডিয়ার ব্ল্যাক ম্যাজিক ক্যাপিটাল? এইটা? ধুস!”
“আরে ভাই, বছরের পর বছর টুরিস্ট এসে এসে এরকম ম্যাড়ম্যাড়ে হয়ে গেছে জায়গাটা, নয়তো আমার কাকুর কাছে এই গ্রামের যা পুরোনো ছবি দেখেছিলাম, তোর পিলে-টিলে স্রেফ চমকে যেত।”
“রাবিশ, আটার রাবিশ, এসব ব্ল্যাক ম্যাজিক ভুডুইজম, স্পিরিচুয়ালিটি, কিস্যুতে কিস্যু হয় না, সব দুর্বল মনের ভুল।”
“নাহ্ তোকে আনাটাই আমার বড্ড ভুল হয়ে গেছে মাইরি, তুইও ফ্যামিলির সাথে সাইট সিনেই যেতে পারতিস।”
“আহ্, রাগ করিস কেন, আমি জাস্ট তোকে এনলাইটেন করছি।”
“ভাই ইয়ার্কি না, এই পুরো গ্রামের পেশা-নেশা এটাই, সো বি সিরিয়াস, আমার কাজটা সেরে বেরিয়ে যাব।”
“ওকে ব্রাদার, এই কুলুপ আঁটলুম মুখে।” মুখে আঙুল দিয়ে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসতে থাকে অরিত্র।
উফ কী কুক্ষণে যে একে নিয়ে এসেছিলাম! এত বয়স হয়ে গেছে, ব্যাংকের একটা গোটা ব্রাঞ্চ সামলায়, অথচ ছেলেমানুষি গেল না, ভাবতে থাকে শোভন। এদিকে এই জায়গাটায় একা আসতে তার সাহসেও কুলোয়নি, আর অন্য কাউকে বললে সে হেসেই উড়িয়ে দিত। এইদিক থেকে অরিত্র একদম সেফ, সেই স্কুল জীবনের বন্ধু তারা, ডিডি গেঞ্জির মতোই একদম চোখ বন্ধ করে ভরসা-টরসা করাই যায়। দুই বন্ধুর ফ্যামিলি মিলে আসামে বেড়াতে এসেছে তারা। অবশ্য শোভন যে শুধু বেড়াতে এসেছে এ-কথা বলা ভুল, একটা কাজ নিয়েও এসেছে, আর সেটার জন্যই আসামের এত ভালো ভালো স্পট ছেড়ে এই অদ্ভুতুড়ে গ্রামে আসা।
“তুই শিওর?” অরিত্র প্রশ্ন করে গাড়ি থেকে নামার মুখে।
“কী ব্যাপার বলত?”
“তোর এই গুনিন বাবা তোকে হেল্প করতে পারবে?”
“চেষ্টা করতে ক্ষতি কী?”
“নাহ্ আমি তোকে ডিসহার্টেন্ডও করতে চাইছি না আর অসম্মানও না, বাট ডু ইউ রিয়েলি থিঙ্ক সভ্যতার এই পর্যায়ে এসে মেডিকেল সায়েন্সও যখন তোকে হেল্প করতে পারছে না, এইসব হাতুড়ে ওঝা গুনিন তোকে হেল্প করবে?”
“দেখ তুই আমার সবটাই জানিস, সেই শুরু থেকে, আর এই ব্যাপারটা নিয়ে আমি আর সুষমা, আমরা কী পরিমাণ জ্বলেছি বা এখনও জ্বলছি তোর অজানা নয়। ডাক্তার-হাসপাতাল, মন্দির-মসজিদ-ভগবান সবই যখন কমপ্লিট, তখন শয়তানই বা বাদ যাবে কেন বল?”
“দেখ আমি তোকে আঘাত করার জন্য কথাটা বলিনি কিন্তু।”
“আমি জানি ভাই, তুই মুখে খিল্লি করলেও মনে আমার ভালোই চাস আর তাই আজ সকালে দুই ফ্যামিলিকে কী সুন্দরভাবে ম্যানেজ করে সাইটসিনে পাঠিয়ে দিলি আমাদের এই মায়াং অভিযানের গোপনীয়তা রক্ষা করতে, স্রেফ আমার মুখ চেয়ে।”
“ব্যস ব্যস আর সেন্টি দিস না, তা এই এত বড়ো গ্রামে সে লোককে খুঁজে পাবি তো?”
“কাকার ডায়েরিটা হ্যায় না, ওতে সব স্পষ্ট বলা আছে, শুধু সমস্যা একটাই দীর্ঘ ৩০ বছর আগেকার লেখা তো, এখন গ্রামের অনেকটাই বদলে গেছে দেখছি, দেখি খুঁজে পেতে।”
অরিত্র আর শোভন রুক্ষ পাহাড়ি পথ ধরে এগোতে থাকে সেই মায়ং গ্রামের দিকে।
.
।। দুই।।
গ্রামের প্রায় প্রতিটা ঘরেই জলপোড়া, হাত দেখা, পিঠে থালা বেঁধে ব্যথা সারানো, বশীকরণ, ভাগ্য উদ্ধার ইত্যাদির মেলা লেগেছে যেন। দূর দূরান্ত থেকে লোক এসেছে, পোশাক-আশাক মালুম দিচ্ছে বেশিরভাগই ‘ট্যুরিস্ট, আবার কিছু বিদেশিও আছে তার মধ্যে।
“এদিক-ওদিক সব দিকই তো কভার করে ফেললাম ব্রাদার, কিন্তু তোর ‘আজার’ বাবার তো নো পাত্তা, কেউ তো কিচ্ছু বলতে পারছে না।” বলে ওঠে অরিত্র।
“হুম তাইতো দেখছি রে, কাকা যে গাছ আর কুটিরের কথা ডায়রিতে লিখে গেছেন সেই লোকেশানে তো বড়ো একখানা মন্দির দেখছি, তাহলে ভদ্রলোক কি আর বেঁচে নেই? নাকি আমরা ভুল জায়গায় খুঁজছি? নাহ্ স্রেফ ডায়েরির ওপর ভরসা করে এতদূর আসাটা ঠিক হয়নি বোধহয়।” বিড়বিড় করে ওঠে শোভন।
“আপলোগ কিসিকো ঢুন্ড রহে হো ক্যায়া?”
পাশ থেকে একটা প্রশ্ন ধেয়ে আসে তাদের দিকে। এক স্থানীয় ভদ্রলোক।
“বাঙালি নাকি?”
“হ্যাঁ দাদা, একজনকে খুঁজছিলাম।” শোভন উত্তর দেয়। “কী নাম?”
“আজারি বাবা।”
“এখানে তো ঘরে ঘরে অনেক বাবা আছেন, কিন্তু এই নামে তো কাউকে চিনি না মশাই।”
“হাঁ, এই উত্তরই তো সবার কাছ থেকে পাচ্ছি, হয়তো আগে ছিলেন কী জানি।” শোভন মাথা নাড়ে।
“আচ্ছা তুই কাকার ডায়েরিটা একবার মন দিয়ে আবার পড়তো যদি কিছু রেফারেন্স পাস।” অরিত্র বলে ওঠে।
“হুম, আচ্ছা শেরবাবা বলে কেউ আছেন?” শোভন প্রশ্ন করে।
“কী নাম বললেন?” স্থানীয় ভদ্রলোকটি বেশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জরিপ করতে থাকে অরিত্রকে।
“শেরবাবা।”
“হ্যাঁ আছেন বটে, কিন্তু আপনি এই নাম জানলেন কীভাবে?”
“আমার কাকা ওনার কাছে এসেছিলেন বহু আগে, আমাদের প্লিজ ওনার কাছে নিয়ে যাবেন, যা টাকা লাগে আমি দিতে প্রস্তুত।”
“নাহ্, শুধু আমি কেন কেউই নিয়ে যাবে না আপনাদের তাঁর কাছে, সে আপনি যতই পয়সার লোভ দেখান। উনি অত্যন্ত জাগ্রত পুরুষ, এই গ্রামের সব থেকে প্রাচীন ওঝা, উনি না চাইলে বাইরের কোনো লোক উনার সাথে দেখা করতে পারে না।”
“আপনি দয়া করে আমার কাকার নামটা ওনাকে গিয়ে জানাতে পারবেন, যদি কিছু হয়!”
“বেশ আমি যাচ্ছি জানাতে, আপনারা এখানেই দাঁড়ান, উলটো-পালটা কিচ্ছু করার চেষ্টা করবেন না, তাহলে ফল কিন্তু ভালো হবে না, জানেন তো হাজারটা ট্যুরিস্টের মোবাইল ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইটে গ্রামটা আজ আলোকোজ্বল দেখালেও, পাহাড়ের খাঁজগুলো এখনও ততটাই অন্ধকার।” লোকটা চলে যায়, অরিত্রর মুখের দিকে তাকায় শোভন, নাহ্, সদা ফিচকেময় অরিত্রর মুখেও বেশ একটা চিন্তার ছাপ, তারা অপেক্ষা করতে থাকে…
.
।। তিন।।
“ঘর না বলে এটাকে গুহাই বলা ভালো, কী বলিস শোভন? আমার কিন্তু বেশ ত্রিপী লাগছে ব্যাপারটা।” ফিশফিশ করে বলে ওঠে অরিত্র।
“হুম।” মাথা নাড়ে, শোভন, চারপাশটা ভালো করে চোখ বুলিয়ে নেয় সে।
দেয়াল জুড়ে অদ্ভুত অদ্ভুত মুখোশের মেলা, তাক ভর্তি প্রাচীন পুথিপত্র, বিছানার একপাশে রাখা রং-বেরঙের কাচের বয়াম আর মেঝেতে পা ফেলার উপায় নেই, সেখানে হাজারটা ছোটো ছোটো টব, তাতে নাম না-জানা কত গাছ, সবমিলিয়ে বেশ একটা অগুরু পরিবেশ বইকি।
“উফ লোকটা যে হারে জংলি পথ, পাথুরে জমি, চোরা ঝর্না পার করে আমাদের নিয়ে এল তোর শের বাবার কাছে, আমি তো ভাবলাম এরাই না আমাদের ব্ল্যাক ম্যাজিকের উপাদান বানিয়ে দেয়, একদম ঘচাং ফু!”
“আহ্ ইয়ার্কি মারিস না ভাই, চুপ কর।”
একটা আওয়াজ হয়, ভেতর থেকে একটা দরজা খুলে যায়, দেখা যায় সেই স্থানীয় লোকটা ধরে ধরে নিয়ে আসছে এক অতি বৃদ্ধ ব্যক্তিকে, তাকে বিছানার ওপর বসিয়ে দেয়।
“এই তোর চমৎকারী বাবা? এর নিজের চমৎকার-ই তো অস্তগামী।” ফিশফিশিয়ে বলে ওঠে অরিত্র।
শোভন কোনো জবাব না দিয়ে অরিত্রর দিকে কটমট করে তাকিয়ে থাকে।
“জরা তো ভগবানকেও রেহাই দেয় না বাবা।” আমি তো মানুষ।
ওই বুড়ো মানুষের গলায় আর কানে যে এত জোর থাকতে পারে, সে-কথা তারা ভাবতেও পারেনি, চমকে ওঠে দুজনেই।
“তোমাদের মধ্যে শৈলেন্দ্রনাথের ভাইপো কে আছো?”
“আজ্ঞে আমি, শোভন এগিয়ে যায়।”
“তুমি থাকো আর বাকিরা বাইরে যাও।”
শোভনের দিকে ম্লান মুখে তাকায় অরিত্র, সেই স্থানীয় লোকটি ইতিমধ্যে তাকে বাইরের রাস্তা দেখাতে শুরু করেছে।
“আর শোনো হে ছোকরা, ব্ল্যাক ম্যাজিক জীবের ওপর খাটে, প্রকৃতির ওপর নয়। তাই আমরা চাইলেও আমাদের হাজারো তুকতাক দিয়ে প্রতিবছর ধেয়ে আসা এই আসামের বন্যাটাকে আটকাতে পারি না।”
“নাহ্ মানে আপনি কীভাবে…” থতোমতো খেয়ে যায় অরিত্র।
“আই নো সার্টেন থিংস, আই ডু সার্টেন থিংস, যাকগে তুমি আশা করি তোমার উত্তর পেয়েছ, এবারে তুমি বাইরে যাও।”
অরিত্রের মুখের দিকে তাকায় শোভন, বেচারি বড্ড শক পেয়েছে, মুখ একদম কাঁচুমাচু করে বেরিয়ে যায় ঘরের বাইরে, দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ হয়ে যায়।
“অবাক হলে নাকি?” গমগমে গলায় বৃদ্ধ প্রশ্ন করে। “নাহ্, মানে আপনি কীভাবে ওর এই কথা জানতে পারলেন, এটা তো ও আমাকে আজ সকালে হোটেলে বলেছে।” শোভন আমতা আমতা করে প্রশ্ন করে।
“নাথিং জাস্ট থট রিডিং, এসব টুকটাক ক্ষমতা চর্চা করলেই জন্মায়, এতে অবাক হওয়ার কিচ্ছু নেই।”
“তাহলে আপনি নিশ্চয়ই এটাও জানেন, আমি কী জন্য এসেছি আপনার কাছে?”
“দেখি তোমার হাতটা।” অদ্ভুত শীতল বুড়োর হাতটা, শোভনের হাতটা ধরে সে কিছুক্ষণ চোখ বুজে বিড়বিড় করে।
“জীবনের তোমার কোনো কিছুরই অভাব নেই, আছে শুধু একটা জিনিসেরই, সন্তানের, তাই তো? হাজারো ডাক্তার, বদ্যি, মন্দির-মসজিদ ঘোরা হয়ে গেছে, কিন্তু লাভ হয়নি, তাইতো?”
“হ্যাঁ বাবা।”
“তা আমার কাছে কেন এসেছ?”
“আমার কাকা শৈলেন্দ্রনাথ নামকরা শিকারি ছিলেন, উনি বাজে কথা বলার লোক ছিলেন না, ওনার এক ডায়েরিতে আপনার কথা জানতে পেরেছি, আপনার ঐশ্বরিক ক্ষমতার কথা।”
“প্রথমত ইশ্বরের সাথে তুলনা করে তুমি শুরুতেই বোকামো করে ফেললে, আর দ্বিতীয়ত আই এম টু ওল্ড, টু টায়ার্ড, আর এখন এসব করি না, পারি না।”
“তাহলে আমার স্বপ্নটা বৃথা হবে বাবা?” একটা নিঃশব্দতা গ্রাস করে ঘরটাকে।
“প্রকৃতি বড্ড অদ্ভুত নিয়মে চলে বাবা, এখানে সবটাই মাপাজোখা, তাকে যদি জোর করতে হয় তবে বলিদান প্রয়োজন, ওদিকে কমলে এদিকে বাড়বে, ওপারে কেউ গেলে তবেই এপারে কেউ আসবে, স্যাক্রিফাইস করতে পারবে, স্যাক্রিফাইস?”
“আমি যে-কোনো স্যাক্রিফাইসের জন্য প্রস্তুত বাবা।”
“মূর্খ, মূর্খ, হাহা-হাহা।” যেন নেশাগ্রস্ত পিশাচের মতো হেসে ওঠে সে বৃদ্ধ। ওরকম একটা হাড়-জিরজিরে বুড়ো যে এরকম অট্টহাসি হাসতে পারে, এ তার কল্পনাতীত, তার গায়ে কাঁটা দেয়।
“শোন তাহলে ওই বাম তাকে একটা লাল বাক্স আছে, ওটা নিয়ে যা, ওর মধ্যে বলা আছে যা করতে হবে, এক্ষুনি গিয়ে সব করে ফেলবি, আর হ্যাঁ, আজ মধ্যরাতে যখন পূর্ণচাঁদ উঠবে তখন তোকে আবার এখানে আসতে হবে।”
শোভন বুঝে উঠতে পারে না, সে কী করবে, বৃদ্ধ মাতালের মতো কেঁপে চলেছে।
“ভয় পাস না, ডমরু গাড়ি করে তোকে নিয়ে আসবে ঠিক রাত্রিবেলা, স্যাক্রিফাইস ইজ অল ইউ নিড, এখন যা দেখি, যা এখান থেকে পালা।”
.
।। চার ।।
উফ্ কী ভয়ংকর একটা দিন গেল বটে, ওই স্যাঁতসেঁতে ঘর, মোমের ঘোলাটে আলো, আর ওই অট্টহাস্যকারী বুড়োটা, সবটাই যেন এখনও স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে।
হোটেলের বাথরুমে, বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে চোখে- মুখে জল দিচ্ছিল শোভন। একটাই বাঁচোয়া ফ্যামিলি এখনও ফেরেনি রুমে, আর অরিত্রও কেমন একটা গুম মেরে গেছে সেই ঘটনার পর থেকে। কাঁপা কাঁপা হাতে ব্যাগ থেকে লাল বাক্সটা বের করে আনে শোভন, আরও একবার চারপাশটা দেখে নেয় সে, জানে কেউই নেই, তবুও তার মনে হচ্ছে কে যেন কনস্ট্যান্ট তাকে দেখে যাচ্ছে।
একটা দুমড়ানো-মোচড়ানো পুথির পাতা, দুটো শুকনো গাছের ডাল, দুটো নখ তার দিয়ে জড়ানো, দেখে বাঘের নখ বলেই মনে হচ্ছে আর একটা তেলের শিশি, একটা শুকনো অচেনা ফুল, ব্যস আর কিচ্ছু নেই। ভাগ্যবশত সে সংস্কৃতটা পড়তে পারে, তাই বাঁচোয়া। জরাজীর্ণ পাতাটা শোভন আলোর দিকে তুলে ধরে, পড়ার চেষ্টা করতে থাকে।
“কিন্তু আপনি আমাকে এতটা হেল্প কেন করছেন বাবা?”
“তোর কাকার আমার ওপর অনেক বড়ো দান ছিলরে।”
“দান?”
“আমার এই নামটা কেন জানিস, আমি বাঘের চোখের দিকে চোখ রেখে বাঘ বশ করতে পারতাম, কাউকে ডরতাম না, একদিন এরকমই ক্ষমতার দম্ভে গভীর জঙ্গলে এক বাঘকে নিয়ে ছেলে-খেলা করছিলাম, ভুলে গেছিলাম আরও একজোড়া চোখ আড়াল থেকে আমাকেও লক্ষ করছে। সেই বাঘেরই জোড়া, বাঘিনি।
জোয়ান বয়স, তন্ত্রের নতুন ক্ষমতায় নিজেকে ঈশ্বর ভাবতে শুরু করেছিলাম আমি মাশুল দিতে হয়েছিল হাতেনাতে, ঝোপের আড়াল থেকে বিশাল ডোরাকাটা একটা চেহারা আচমকা এসে দাঁড়িয়েছিল আমার সামনে, আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়, সব দম্ভ, সব বিদ্যা সব তন্ত্র, ভুলে গেছি মৃত্যুকে সামনে দেখে। হঠাৎ একটা তীব্র গুলির আওয়াজ, থরথর করে কেঁপে উঠল সেই ডোরাকাটা বিভীষিকা, দূর থেকে দেখলাম এক শিকারির পোশাক পরা মানুষ আমার দিকে এগিয়ে আসছে…”
.
“এই ওঠো ওঠো, আর কতক্ষণ ঘুমাবে, আর ও কী পাগলের মতো বিড়বিড় করে চলেছ বলো তো?” সুষমার ডাকে ঘুম ভাঙে শোভনের।
জানলা দিয়ে তীব্র সূর্যের আলো, সে তাকাতে পারছে না, সারা গা হাত-পায়ে অসম্ভব ব্যথা, মাথার শিরাগুলো ফুলে রয়েছে, কেউ যেন হাতুড়ি মারছে মাথায়।
“আর কাল রাতে ওটা কী অসভ্যতা হল?”
“কীসের?”
“ও তোমার কিছু মনেই নেই তাহলে? কী খেয়েছিলে শুনি? দেখো বাইরে এসেছ বলে একবার অ্যালাউ করলাম।”
“আরে কী অ্যালাউ করলে? আমার কিচ্ছু মনে নেই।” মাথাটা দু-হাতে চেপে ধরে শোভন।
“সেই যে অরিত্রর সাথে পার্টি করতে যাওয়ার নাম করে রাতে বেরিয়ে গেলে, আর তারপর ফিরে এসে কী কাণ্ডটাই যে না করলে, কী খেয়ে এসেছিলে শুনি?
“আমার কিচ্ছু মনে নেই।”
“মনে নেই বললেই হবে, কাল কি পাগল হয়ে গেছিলে?”
“কেন বলো তো? আমার তো কিছুই মনে পড়ছে না।” অসহায়ের মতো মাথা নাড়ে শোভন!
“উম, ন্যাকা! লাস্টবার মিসক্যারেজের পর থেকে যে শোভন আমার কাছেই আসতে চাইত না, সে কাল শেষরাতে আমাকে ঘুম থেকে তুলে কী না করল, সারা গায়ে আঁচড়ে-কামড়ে দাগ করে দিয়েছ, এই দেখো, দেখো, যেন মনে হচ্ছিল কোনো হিংস্র বাঘের সাথে এক খাঁচায় রাত কাটাচ্ছি।” এই অবধি বলেই খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেল সুষমা।
“বাঘ?” উফ শব্দটা শুনতেই যেন মাথার শিরাগুলো দপদপ করে উঠল। নিজের হাতের নখগুলোয় লেগে থাকা রক্তের শুকনো দাগগুলো দেখছিল শোভন।
“গুড মর্নিং স্যার, ভেতরে আসব?”
“আসো।”
“স্যার এই যে আপানাদের বেড টি।”
“টেবিলে রেখে দাও।”
“স্যার আপনারা কাল যে গ্রামে ঘুরতে গেছিলেন না, মায়ং!”
“হুম, তো?”
“অনেকদিন পর কাল রাতে সেখানে বাঘ পড়েছিল, আর শেরবাবা বলে একটা বুড়োকে নাকি জঙ্গলে টেনেও নিয়ে গেছে বাঘটা।” রুম বয়ের আর কোনো কথা শোভনের কানে যায়নি, সে একছুটে বাথরুমে চলে এসেছিল, তার প্রচণ্ড বমি আসছে, আর কানে একটাই অট্টহাসি ভাসছে, ‘ওদিকে কমলে এদিকে বাড়বে, ওপারে কেউ গেলে তবেই এপারে কেউ আসবে, স্যাক্রিফাইস করতে পারবে? স্যাক্রিফাইস ইজ অল ইউ নিড…!’







