সুযোগ
অরিত্র একটা পারফেক্ট লাইফ কাটাচ্ছে।
মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে একটা উচ্চপদস্থ চাকরি, সাউথ কলকাতার বুকে থ্রি বি এইচ কে একটা বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, যেখানে সে থাকে সুলগ্নার সঙ্গে। সুলগ্না, যাকে বলে একেবারে ডাকসাইটে সুন্দরী, আজ ছয় বছর ধরে অরিত্রর গার্লফ্রেন্ড, সেই কলেজ জীবন থেকে শুরু, একেবারে পারফেক্ট প্রেম।
তো এইরকম একটা পারফেক্ট লাইফ যদি আপনি লিড করেন, যেখানে আপনার স্বপ্নের চারাগাছখানা ধীরে ধীরে মহিরুহে পরিণত হচ্ছে, প্রতিটা সিদ্ধান্ত সঠিক পরিণতি পাচ্ছে, আপনারও ইচ্ছে করবে কিনা স্বপ্নের ইটখানা দিয়ে বাস্তবের ইমারতখানা এবারে বানিয়েই ফেলি?
অরিত্রও চেয়েছিল ঠিক এটাই।
তাই তাদের সপ্তম অ্যানিভার্সারির দিনটাই সে বেছে নিয়েছিল সারপ্রাইজ দিতে। দুজনেই দুজনার অফিস থেকে জলদি জলদি বেরিয়ে, তাদের মনপসন্দ মেইন ল্যান্ড চায়নাতে একটা সুন্দর সন্ধ্যাযাপন, আর শেষপ্রহরে এত বছরের রিলেশানটাকে এবারে একটা সামাজিক সার্টিফিকেট দেওয়া, এই ছিল সারপ্রাইজখানা।
যদিও সুলগ্না ঘরেই কিছু একটা রান্না করতে চেয়েছিল, কিন্তু অরিত্র নারাজ, সে রেস্টুরেন্টেই যাবে, হি ওয়ান্টস দিস ডে টু বি স্পেশাল। সুলগ্নাকে বিন্দুমাত্র আভাস পেতে না দিয়ে, সন্ধ্যের একদম মুখোমুখিই অরিত্র পৌঁছে গেছিল গন্তব্যে। কিন্তু ১০ মিনিট, ২০ মিনিট, উফ সুলগ্না আজ এত দেরি করছে কেন? ফোনে কিছুটা রূঢ় ভাবেই সুলগ্নাকে বকে ফেলে সে, পাংচুয়ালিটি নিয়ে তীব্র একটা ভাষণ ঝেড়ে ফেলে।
এতটা বলা বুঝি ঠিক হল না আজকের দিনে, ও ঠিক পরে ম্যানেজ করে নেব, ভাবে অরিত্র। এক ঘণ্টা, দু ঘণ্টা, কিন্তু সুলগ্নার কোনো দেখা নেই, না ওর আসছে ফোন। রাত বাড়ছে, ধৈর্যের পর্দাটাও ক্রমশ পাতলা হচ্ছে, সারপ্রাইজের পারদ প্রায় নিভু নিভু। অবশেষে সুলগ্নার ফোন, ওপাশে একটা অপরিচিত গলা, ভীত সন্ত্রস্ত, বিমর্ষ।
হড়বড়িয়ে বলে চলা একগাদা কথার মাঝে কয়েকটা শব্দই অরিত্র শুনতে পায়, এক মহিলা, গাড়ি দুর্ঘটনা, মৃত, এটা তারই মোবাইল…..
.
।। দুই।।
সেই ঘটনার পরে দু’সপ্তাহ কেটে গেছে। আজই ছিল সুলগ্নার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান। যদিও অরিত্র যেতে চায়নি, কিন্তু দুই পরিবার প্রায় জোর করেই তাকে নিয়ে গেছে। সেখান থেকে ফিরে নিজের ফাঁকা ফ্ল্যাটে বসে আছে অরিত্র, সুলগ্নার সব থেকে প্রিয় ছবিটা বুকে নিয়ে সে কাঁদছে। কারণ বাকি কেউ না জানলেও সে তো জানে, সুলগ্নার এই অকালে চলে যাওয়ার পেছনে কে দায়ী।
সে নিজে। হ্যাঁ, সে নিজে।
সেদিন যদি দেরি হওয়া নিয়ে সে এতটা ওভাররিয়্যাক্ট না করত, তাহলে বুঝি সুলগ্না অত তাড়াহুড়োটা করত না, আর আজ এই দিন দেখতে হত না।
তার জন্যই সুলগ্না আজ মৃত।
হা ঈশ্বর, নিজের কৃতকর্মের জন্য কি কোনো এডিট বাটন নেই? আর একবার কী সে সুযোগ পেতে পারে না, নিজের ভুলটা শুধরে নেওয়ার? ঠিক তখনই তার চোখ থেকে ঝরে পড়া জলের মতোই তার অজান্তেই রাতের কালো আকাশ থেকেও দুটো তারা খসে পড়ে। মদ আর কান্নায় ক্রমাগত ভিজতে ভিজতে নিজেকে দুষতে-দুষতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে সে।
ফোনটা বাজছে, ঘুম ভেঙে যায় অরিত্রর। আরে শোভন না, কী ভেবে এত সকালে ফোন করছে? সে কি জানে না কিছু, শুধু শুধু বিরক্ত করা….
“কীরে শালা জীবনের প্রথম সেমেস্টারের প্রথম দিনটা মিস করবি? আচ্ছা আহাম্মক তো তুই?”
“মানে?”
“মানে আবার কী? টাইমটা দেখ, আজ তারিখটা মনে নেই?”
মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ যায় অরিত্রর, হা ঈশ্বর, তার পৃথিবী নড়ে যায়। কোথায় তার সেই বিলাসবহুল অট্টালিকা, এটা তো সেই ছেলেবেলার মায়ের গন্ধ মাখা উত্তর কলকাতার ঘিঞ্জি বাড়িখানা! আয়নায় চোখ পড়ে, হা ভগবান কীভাবে সে সাত বছর পিছিয়ে যেতে পারে, পা দুটো টলতে থাকে তার প্রশ্নের ভারে, কিন্তু উত্তর তাকে জানতেই হবে।
“বাবু, কিছু খেয়ে যা, প্রথম দিন এভাবে যাসনি।” মায়ের কথার উত্তর দেওয়ার সময় আর নেই, প্রাণ হাতে নিয়ে দৌড় লাগায় অরিত্র কলেজের দিকে। সে নিজের ক্লাসকে চিনতে পারে, ওই তো শোভন হাত নাড়ছে। সেম ক্লাস, সেম প্রফেসর, সেম সিট।
“কী বে শালা এত দেরি কেন?” শোভনের প্রশ্নের উত্তর দেয় না সে, তার চোখ এখন আটকে আছে দরজার দিকে। আর হ্যাঁ, ঠিক তাই, সেই সাত বছর আগের মতোই ব্লু জিন্স, কালো শার্ট আর ঘাড়ে একটা ট্যাটু, দরজার কাছে সুলগ্না এসে দাঁড়িয়েছে। অরিত্র চিৎকার করে দৌড়ে যেতে চায়, তাকে জড়িয়ে ধরতে চায়, নড়িয়ে দেখতে চায়, জাপটে ধরে চুমু খেতে চায়, কিন্তু না…
“মে আই সিট হিয়ার?” ঠিক সেই সাত বছর আগের মতোই।
“নাহ্, দা সিট ইজ অলরেডি টেকেন।” অরিত্র জবাব দেয়, এইখানেই সাত বছর আগের সত্যিটার সঙ্গে পার্থক্য ঘটে যায় এক ঝটকায়।
“শালা পাগল নাকি? এরকম একটা মেয়েকে না বলছে?”
“কী বে তোর মাথা খারাপ হল নাকি?” আশেপাশের ফিশফাশ, খিল্লি, সুলগ্নার অবাক হওয়া দৃষ্টি, সবটাই উপেক্ষা করে সে। করতে বাধ্য হয়, কারণ সে জানে কী ঘটতে চলেছে এর পরে।
সবাই দ্বিতীয় সুযোগ পায় না, অরিত্র পেয়েছে, সে সেটা কাজে লাগায়…







