বাসন্তী আম্মা
‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানি সে যে আমার…’
সুরেশের গানটা মাঝপথেই হোঁচট খেল, একটা অদ্ভুত আওয়াজ ভেসে আসছে দূর থেকে, ঠিক যেন কেউ সুর করে কাঁদছে।
“ওটা কীসের ডাক? বার্কিং ডিয়ার নাকি?” গান থামিয়ে সুরেশ প্রশ্ন করল।
“ধুর, হায়না মনে হচ্ছে,” আমি বললাম।
“কিংবা শকুনের বাচ্চাও হতে পারে, ওরা নাকি খিদে পেলে মানুষের বাচ্চার মতন করে কাঁদে।” অরিত্র ফুট কাটল।
আওয়াজটা টানা বেশ কিছু সময় ধরে চলার পর আপনা-আপনিই থেমে গেল, কিন্তু থামল না আমাদের তর্কটা।
আমি, সুরেশ আর অরিত্র তিনজন সেই কলেজের সময় থেকে যাকে বলে একদম হরিহর আত্মা, কর্মসূত্রে তিনজন তিন প্রান্তে থাকলেও বছরে দুইবার করে সময় বের করে বেড়াতে যাবই, সেইসূত্রেই এবারে এই জয়ন্তীতে আসা। মোবাইলের টাওয়ার সেই বক্সা টাইগার রিজার্ভের মেইন গেট পেরোনোর সময় থেকেই নেই, তাই আধুনিকতার সমস্ত বন্ধন ছিন্ন হয়ে কটা দিন স্রেফ পাহাড় আর জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়া এটাই ছিল উদ্দেশ্য।
এই সন্ধ্যেটাও সেরকমই কাটছিল গেস্ট হাউসের দোতলার বারান্দায়। এখানকার বেশিরভাগ কটেজই লোকাল লোকেদের বাড়ি, ফলে অতিরিক্ত বিলাসব্যসন একদম নেই বললেই চলে, আর সেটা বিশেষ সুবিধা হিসেবে জুড়ে গেছে এই গোটা জংলা ব্যাপারটার সঙ্গে।
তাই দূর থেকে ভেসে আসা ঝিঁঝি পোকার একটানা আওয়াজ, পাতার শিরশিরে শব্দ, আর নাম না-জানা পাখির ডাকের মাঝে সুরেশের হেঁড়ে গলায় আবেগতাড়িত গানটাও বেশ জমে গেছিল। কিন্তু বাধ সাধল ওই আওয়াজ, কেমন যেন কেঁপে কেঁপে ওঠা।
“কী নিয়ে আবার ঝগড়া বাঁধল আপনাদের?”
দেখলাম নবীন এসেছে, নবীনের গাড়িতেই প্রায় এই গোটা ট্যুরটা, সাইট সিন সব কিছুই। আজ সকালে লোকাল এরিয়ায় ঘুরছিলাম, গাড়ির দরকার ছিল না। এদিকে আমাদের পছন্দের ব্র্যান্ডের পানীয়ও প্রায় শেষের দিকে, তাই ওকে বলেছিলাম ও যদি শহরে যায় যেন নিয়ে আসে। নবীনকে দেখে সবাই বেশ আনন্দ পেলাম, শুধু পানীয়ের জোগানই নয়, শব্দটার উৎস সম্বন্ধে কিছু আলোকপাত পাব নিশ্চয়ই।
“আরে দেখো না, একটা বেশ জোরালো আওয়াজ বুঝলে, দূর থেকে কীরকম কেঁপে কেঁপে উঠছে মাঝে মাঝে, অরিজিনটা আমারা ঠিক ধরতে পারছি না।”
“ওহ ওটা, ও কিছু না, ও মাঝে মাঝেই হয়, আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে, আপনাদের নতুন বলে কেমন একটা লাগছে।”
“আরে তোমাদের না হয় গা-সওয়া হয়ে গেছে, আমাদের তো বলো কীসের শব্দ ওটা? কোনো পাখির, নাকি কোনো জন্তুর? কীসের?”
“ওসব কিছুর নয়, ঝরনার।”
“অ্যাঁ, ঝরনার? এরকম আবার হয় নাকি? তাহলে তো টানা হত, এটা তো মাঝে মাঝে হচ্ছে।”
“হ্যাঁ মাঝে মাঝেই হয়, তবে পূর্ণিমাতেই হয়। কোথাও মনে হয় জলের গুপ্ত সোর্স আছে, জল জমতে জমতে ভরে গেলে মাঝেমধ্যে ওইভাবে ওপর থেকে ঝরে পড়ে যখন ওরকম বিকট প্রতিধ্বনি হয়।”
“মনে হয় মানে? তুমিও সঠিক জানো না?”
“দেখছেন তো কীরকম পাথুরে জঙ্গল, তারপর হাতি বাঘ-সাপের ভয়, একদম ভেতরের কোর এরিয়ার সব জায়গায় হয়তো মানুষের পা-ও পড়েনি এখনও, তবে হ্যাঁ আমাদের বাপ-দাদুর কাল থেকে ওরকমই শুনে আসছি, ঝর্না ছাড়া আর কী হবে।”
“হুম, যাকগে, বেশ ইন্টারেস্টিং লাগল কিন্তু গোটা ব্যাপারটা।”
“আরও লাগবে, এই গোটা ব্যাপারটা নিয়ে একবার আপনাদের গেস্ট হাউসের বুড়ো কেয়ারটেকারকে চাগিয়ে দেবেন, দেখবেন না কী হয়। যাকগে কাল সকাল দশটার মধ্যে রেডি থাকবেন কিন্তু, আমি গাড়ি নিয়ে চলে আসব।”
“আরে তুমি এর মধ্যে উঠে পড়লে নাকি, দু পাত্তর মেরে যাও।”
“ওরে বাবা সন্ধ্যে নেমে গেছে, এর পরে রাস্তায় নামলে শিওর হাতির পালের সামনে গিয়ে পড়ব, আর আপানদের সাথে কাল সকালে দেখা হবে না।” খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসতে হাসতে নবীন বেরিয়ে যায়।
“সবে সাড়ে ৬টা বাজে, এর মধ্যেই চারপাশে যেন গভীর রাত, অদ্ভুত জায়গা কিন্তু।” সুরেশ বলল।
“হুম, ভয়ংকর কিন্তু সুন্দর,” আমি মাথা নাড়লাম …
.
।। দুই।।
“রাতের খাবার নিয়ে এলাম, বেশি কিছু করতে পারিনি, এই পরোটা আর মাংস কষা আর একটু চিলি পনির আছে, আপনারা খেয়ে নিন, না হলে ঠান্ডা হয়ে যাবে।”
মুনশিজি এলেন, আমাদের গেস্ট হাউসের সেই বুড়ো কেয়ারটেকার।
“আরে করেছেন কী মুনশিজি, এটা তো বিশাল আয়োজন, বসুন বসুন আপনিও একটু হাত লাগান, বিকেলের মুড়ি পেঁয়াজি পেটে এখনও গজগজ করছে, এত খাবার আমাদের এখন নামবে না, নষ্ট হবে।”
“আরে না না, আমি আবার কেন, আমার তো রান্না করা আছে।”
“আরে বসুন তো মশাই, দুদিন পরে চলে যাব, একটু আলাপ-পত্র সেরে নি, আবার কবে দেখা হবে না হবে, এই দে না মুনশিজিকে একটা গ্লাস,” আমি বললাম।
কিন্তু-কিন্তু করেও শেষপর্যন্ত মুনশিজি বসলেন আমাদের সঙ্গে, আসলে ওনাকে জোর করার একটা কারণও ছিল আমাদের।
“আচ্ছা মুনশিজি আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?”
“হ্যাঁ, বলুন না।”
“এই যে সন্ধ্যের দিকে মাঝে মাঝে দূর থেকে ওই শব্দটা ভেসে আসছে ওটা কী বলুন তো।”
“হে হে ওই ছোকরা ড্রাইভার নিশ্চয়ই আপনাদের বলেছে এই বুড়োকে খেপিয়ে দিতে।”
“আরে না না আসলে আমাদেরই জানার আগ্রহ ছিল ব্যাপারটা।”
“না না ঠিক আছে, আসলে এখনকার ছেলে-ছোকরাগুলো ঠিক পুরোনো ব্যাপারগুলো মানতে চায় না, প্রাচীনদের কথা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করে।”
“আপনি নিশ্চিন্তে আমাদের বলতে পারেন, আমরা কিন্তু খুব ভালো শ্রোতা।”
আমরা গোল হয়ে বসলাম। মুনশিজি বলতে শুরু করলেন, “এটা আমার একদম ছোটোবেলার ঘটনা বুঝলেন, অল্প অল্প যা মনে আছে বলছি। আমাদের কয়েক ঘর নিয়ে এই গ্রাম ছিল বুঝলেন, তখন আরও গভীর জঙ্গল, যোগাযোগ ব্যবস্থা বলতে কিছুই ছিল না তেমন, ছোটো ছোটো কাঠের বাড়ি কয়েকটা, আপদে-বিপদে সবার পাশে সবাই থাকত। আর একজন অবশ্য ছিল, ঢাল হয়ে আমাদের সবাইকে আগলে রাখত এই জঙ্গলের সব বিপদ থেকে।”
“কে?” আমি প্রশ্ন করলাম।
“বাসন্তীআম্মা, বাচ্চা-বুড়ো সবাই ওই নামেই ওনাকে ডাকত। আপনারা সকালে পোখরিপাহাড় বলে যে জায়গাটা গেছলেন দেখতে, উনি সেখানে থাকতেন একা।”
“একা? তা কী করে সম্ভব, মানে এখন যা দেখলাম জায়গাটা পাহাড়ের একদম মাথায়, একটা ন্যাড়া মতো জায়গা, শুধু একটা পুকুর আছে, ওরকম একটা জায়গায় মানুষ থাকবে কী করে?” প্রশ্ন করল অরিত্র।
“ঠিক তাই, অন্যরা পারবে না, কিন্তু আম্মা পারতেন, ওই উঁচু জায়গায় একা একটা কুটির বেঁধে থাকতেন, বাঘ হাতি, এমনকি সাপ-খোপেরও কোনো ভয় ছিল না ওনার, বরং সবাই ওনাকে ভয় পেত।”
“বলেন কী?”
“হুম, ব্যাপারটা এখন অবিশ্বাস্য ঠেকলেও এসব কিন্তু আমার নিজের চোখে দেখা, উনি অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারতেন, এমনকি মড়াও বাঁচাতে পারতেন।”
“অ্যাঁ বলেন কী মশাই? এ আবার সম্ভব নাকি?” অরিত্র নিজের স্বভাবজাত শহুরে খিল্লি শুরু করলে, বুড়ো মানুষটা যদি খচে গিয়ে গল্প বলা বন্ধ করে দেয়, তাই আমি অরিত্রকে হালকা করে খোঁচা দিয়ে চুপ করতে বললাম।
“হয় মশাই হয়, যে-সময়ের কথা বলছি তখন আপানদের ওই হাতের যন্ত্রটা ছিল না, ছিল না জলপাই- রঙা-দের এত আনাগোনাও, এত সুন্দর পাকা রাস্তা তখন কোথায়, এখন আর কী জঙ্গল দেখছেন, সামনের পাঁচহাত দূরের মানুষকে তখন দেখা যেত না, এত গভীর ছিল এই জঙ্গল।”
“কিন্তু আপনারা এইভাবে এখানে থাকতেন কীভাবে?”
“ওইভাবেই প্রকৃতির সাথে কখনও লড়ে আর কখনও আপস করে। বাপ-দাদারা ওদেশ থেকে এসে নদীর ধারে কটা ঘর মিলে বাসা বেঁধেছিল, সেই থেকেই এই গ্রাম বুঝলেন কিনা, আমরাও আর ছেড়ে যেতে পারিনি, এখানেই কাল কেটে গেল।”
“আর বাসন্তীআম্মা?”
“ও হ্যাঁ যেটা বলছিলাম, আসলে বয়স হয়ে গেছে তো তাই কথার খেই হারিয়ে যায়, বাসন্তীআম্মাকে জন্মাবধি আমরা একইরকম দেখে আসছি। কত বয়স ছিল ওনার সেটা অবশ্য বলতে পারব না, তবে আমরা একইরকম দেখে আসছি, বাপ-দাদার কাছে শুনেছি, ওরাও নাকি আম্মাকে এরকমই দেখে আসছেন।”
“মানে, ঠিক বুঝলাম না ব্যাপারটা।” আমি প্ৰশ্ন করলাম।
“মানে কাঁচা-পাকা একরাশ চুল, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, আর একফালি গেরুয়া কিংবা কালো কাপড় দিয়ে সারা গা ঢেকে রাখতেন, লোকে বলত ওনার নাকি বয়স বাড়ত না, উনি তন্ত্র-মন্ত্র করে আটকে রাখতেন।”
“মানে বেসিক্যালি তান্ত্রিক বা ডাইনি-টাইনি গোছের ছিলেন, মন্ত্র-তন্ত্রের ভোজবাজি দেখাতেন, তাইতো?” আবার একবার অরিত্র হুল বিঁধিয়ে দিল, আমি বলতে বাধ্য হলাম, “আহ্ তুই থামলি, মুনশিজিকে ওনার মতো বলতে দে না।”
“না না ঠিকই আছে, আপানাদের এখনকার ছেলে- ছোকরাদের কাছে এগুলো আজগুবি শোনাবে বই কি, কিন্তু ওই যে বললাম তখনকার অন্ধকারটা আরও বেশি গাঢ় ছিল, যাকগে যাক, হ্যাঁ ঠিকই বলেছেন বাসন্তীআম্মা ওরকমই কিছু একটা ছিলেন বটে, তবে উপকার ছাড়া অপকার কখনও কারও করেননি। তাই অসুখ-বিসুখ, বাঘের কামড় হোক কিংবা সাপের, দূরের শহুরে সরকারি হাসপাতাল নয়, বাসন্তীআম্মাই ছিল আমাদের প্রধান ভরসা।”
“মানে কারও কিছু হলে আপনারা তাকে নিয়ে ওই পোখরি পাহাড় না কী বললেন যেন জায়গাটা সেখানে আম্মার কুটিরে নিয়ে চলে যেতেন?”
“নাহ্, আসলে ব্যাপারটা ঠিক অতটা সোজা ছিল না, আম্মার ওখানে একটা কুটির ছিল বটে, কিন্তু সবসময় উনি ওখানে থাকতেন না, এই পুরো জঙ্গলটাই ওনার অবাধ বিচরণভূমি ছিল। কেউ কোথাও বিপদে পড়লে উনি ঠিক হাজির হয়ে যেতেন তার কাছে, অবশ্যই যদি ওনার ইচ্ছে হত। উনি কিন্তু লোভী, অসৎ লোকদের যত বড়ো বিপদই হোক, কিংবা তার বাড়ির লোক পোখরিপাহাড়ে গিয়ে হত্যে দিয়ে দিনের পড়ে দিন পড়ে থাকলেও আম্মা আসতেন না। ওহ্ একটা জিনিস বলতে ভুলে গেছি, আম্মার একটা পোষ্য ছিল বুঝলেন।”
“কীরকম পোষ্য?”
“একটা ইয়া বড়ো মোটাসোটা অজগর। আম্মার মতোই ওটার বয়স সম্পর্কেও জানা যেত না, চিরটাকাল ওরকম বিশাল শরীরই দেখে এসেছি, তবে কারও ক্ষতি করত না। গ্রামবাসীরা মাঝে-মধ্যে আম্মার কুটিরে ফলটা-মূলটা কিংবা দেশি মুরগি যে যেরকম পারত ভেট নিয়ে যেত, তখন দেখতে পেত, আম্মার কুটিরের আশেপাশে কোথাও গাছের ডালে কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে সাপটা, ও কিন্তু কুটির ছেড়ে একটুও নড়ত না।”
“তা আম্মার অলৌকিক কাজকর্মের কিছু শোনান, আপনি নিজে কিছু দেখেছেন, নাকি সবটাই শোনা?”
“শোনা কেন হতে যাবে স্যার, একবার ছোটোবেলায় আমি আর আমার কয়েক বন্ধু মিলে একটা ডিঙি নিয়ে বুঝলেন খাঁড়ি বেয়ে গভীর জঙ্গলে চলে গেছলাম, ছেলেমানুষি খেয়াল আর কী। ইচ্ছে ছিল সারাদিন তাড়াতাড়ি টুক করে ফলমূল তুলে নিয়ে এসে বনভোজন করব। কিন্তু বিধি বাম, একটা জায়গায় আমরা আটকে গেলাম। জায়গাটা পুরো চালতা গাছ দিয়ে ভরতি। থরে থরে সাজানো কাঁচাপাকা চালতা বুঝলেন কিনা, সে পাড়ছি ফেলেছি সে-ই নিয়ে বল খেলছি, সময় কখন কেটে গেছে বুঝতেই পারিনি। পরে যখন সম্বিৎ ফিরল চারপাশ থেকে শুনলাম পটপট করে আওয়াজ হচ্ছে, বুঝতে অসুবিধা হল না, আমরা চরম বিপদে পড়েছি, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল, দৌড়ে গিয়ে যে ডিঙিতে উঠে চম্পট দেব তারও উপায় নেই, চারিদিক থেকে তারা ঘিরে ফেলেছে।”
“কারা? কারা ঘিরে ফেলেছে?”
“আমাদের মনে ছিল না যে চালতা হাতিদের খুব পছন্দের একটা ফল, দল বেঁধে আসে খেতে, আর হাতির খাওয়া তো জানেনই, জায়গাটা পুরো তছনছ করে দিয়ে চলে যাবে। একটু একটু করে ওরা এগিয়ে আসতে লাগল আমাদের দিকে, আমরা স্থবির হয়ে দেখতে লাগলাম, মনে মনে শুধু বাসন্তীআম্মাকে ডেকে চলেছি। হঠাৎ দেখলাম কী জানেন, আপনারা বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু এই দেখুন এখনও আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। দেখলাম বাসন্তীআম্মা হাতিদের মাঝখান দিয়ে হেঁটে আসছেন, হাতিরা কিছুই বলছে না ওনাকে, উনি এগিয়ে এসে আমার হাত ধরলেন, তারপর ইশারা করে সবাইকে ওনাকে অনুসরণ করতে বললেন। হাতিদের মাঝখান দিয়ে সবাইকে পার করে আবার ডিঙিতে তুলে দিলেন।”
“বলেন কী? সাংঘাতিক ব্যাপার তো মশাই,” অরিত্র ফুট কাটতে ছাড়ল না।
মুনশিজী কিন্তু গা করলেন না, তিনি বলে চললেন, “এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল বুঝলেন, কিন্তু একদিন ভয়ানক দুর্যোগ এসে উপস্থিত হল। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি গ্রামে প্রচুর বাইরের লোক। অতটা ভালো না বুঝলেও এটুকু বুঝেছিলাম যে এক বেশ রাশভারী মুসলিম জায়গিরদার তার একগাদা সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে গ্রামে এসেছেন, বাসন্তীআম্মার অনেক গল্প ওনারা শুনে এসেছেন, চাক্ষুষ দেখবেন ওনাকে।
গ্রামের লোকেরা এত হাতি-ঘোড়া সেপাই-সান্ত্ৰী দেখে ভয়-টয় পেয়ে গিয়ে, পোখরি পাহাড় যাওয়ার রাস্তা দেখিয়ে দিল। কিন্তু বাসন্তীআম্মা দেখা দিলে তো, উনি প্রথম থেকেই জায়গিরদারে অসৎ উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছিলেন।”
“কী উদ্দেশ্য?” আমি আর থাকতে না পেরে প্রশ্ন করলাম।
“জায়গিরদার শুনেছিল বাসন্তীআম্মা অমরত্বের মন্ত্র জানেন, সেটা জায়গিরদারের চাই, তার জন্য যেকোনো মূল্য দিতে উনি প্রস্তুত। কিন্তু বাসন্তীআম্মাকে পেলে তো, দুদিন তাঁবু গেড়ে বসেও যখন কোনো হদিস পাওয়া গেল না তাঁর, তখন জায়গিরদারের নির্দেশে তাঁর লোকেরা সেই পোষ্য অজগরটাকে ধরে নিয়ে চলল, আর গ্রামপ্রধানকে বলে গেল যে এটা নিতে হলে বাসন্তীআম্মা যেন তাঁর সাথে দেখা করেন এবং অমরত্বের মন্ত্র দান করেন, তবেই তিনি তাঁর অজগর ফেরত পাবেন।”
“তারপর?”
“তারপর আর কী, পরের দিন সারা গ্রাম জুড়ে সে কী ভয়ানক অবস্থা, নদী ফুঁসে উঠছে, গাছপালা দুলছে, মাটি কেঁপে কেঁপে উঠছে, ঘন ঘন বাজ পড়ছে। শুনলাম গ্রামপধান নাকি সেই জায়গিরদারকে ডাকতে গেছে, আম্মা নাকি তাকে স্বপ্ন দিয়েছেন, উনি সেই মন্ত্র দিতে রাজি, সঙ্গে করে সে যেন সেই অজগরকে নিয়ে আসে। তারপরে কয়দিন ঠিক কী হয়েছিল আমরা জানতে পারিনি বুঝলেন, ছেলেমানুষ হিসেবে ওদিকে যাওয়া বারণ ছিল, তবে পোখরি পাহাড়ের ওপর কয়দিন যজ্ঞের আগুন দেখা গেছিল।
“জায়গিরদারকে তাহলে উনি সে মন্ত্র দিয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ সেরকমই শুনেছিলাম, তা সে জায়গিরদার তো ফিরে গেল, সবাই ভাবলাম যাকগে সব আপদ বুঝি দূর হল। কিন্তু নাহ্ শেষ বিপর্যয় তখনও বাকি ছিল।
এক সকালে ঘুম ভেঙে দেখি, সারা গ্রামে কান্নার রোল, দূরদূরান্ত থেকে লোক ভেঙে পড়েছে।”
“কেন, আবার কী হল?”
“পোখরি পাহাড়ে কয়েকজন মিলে গেছল বাসন্তী আম্মার কুটিরে কিছু ভেট দিতে, কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখে সর্বনাশ হয়ে গেছে। সারা কুটির কারা যেন তছনছ করে গেছে, চারিদিকে রক্ত আর রক্ত, ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে রয়েছে বিশাল অজগরটা, কিন্তু বাসন্তীআম্মার কোনো হদিস নেই। কারও বুঝতে বাকি রইল না এটা কার কাজ, কিন্তু গরিব মানুষ আমরা কীই বা করতে পারতাম।”
“সে কী? জায়গিরদারের কথা মেনে তো আম্মা ওকে মন্ত্র দান করেছিলেন, তাহলে সে এরকম করতে যাবে কেন? আর তার কোনো শাস্তি হল না? আম্মা কিছু করলেন না?” অরিত্র প্রশ্ন করল।
“ওইখানেই রহস্যটা থেকে গেছিল জানেন, এর পরে আম্মাকে আর কোনোদিন গ্রামে দেখা যায়নি, তবে জায়গিরদার তার প্রাপ্য শাস্তি পেয়ে গেছিল, শোনা যায় তার পুরো বংশ তথা সেপাই-সান্ত্রী নাকি কোনো অজানা রোগে নির্বংশ হয়ে যায়।”
“কিন্তু মুনশিজি আপনি যে বলেছিলেন বাসন্তীআম্মা কোনোদিন মিথ্যে বলতেন না, যা বলতেন তাই ফলে ‘যেত, তাহলে জায়গিরদার মারা গেল কীভাবে, সে তো মন্ত্ৰ পেয়ে ছিল।” আমি প্রশ্ন করলাম।
“ঠিক, একদম ঠিক বলেছেন আপনি, বাসন্তীআম্মা কোনোদিন মিথ্যা বলতেন না, তিনি সত্যিই জায়গিরদারকে সেই মন্ত্র দান করেছিলেন, কিন্তু অসৎ জায়গিরদারের হাতে সেই মন্ত্র যাওয়ার কী ভয়ানক ফল হতে পারে তিনি সেটা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি পুরো কথাটা বলেননি জায়গিরদারকে, সেই মন্ত্রের নিয়ম ছিল, মারা যাবার পর তিনদিন শরীরকে রেখে দিতে হবে, তারপরে তার আবার পুনর্জন্ম হবে এবং সেই বয়সেই সে আটকে যাবে তার আর মৃত্যু হবে না কোনোদিনও।”
“মানে?”
“মানে আর কী, জায়গিরদারের বাড়ির লোকেরা এসব তো জানত না, পরিবারে ওরকম মহামারি লাগার পর বাসন্তী আম্মার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পোখরি পাহাড়েরই কোথাও তাকে সমাধিস্ত করা হয়। তিনদিন পর, একরাতে গ্রামের মধ্যে ওই কেঁপে কেঁপে ওঠা কান্না শোনা যায়, পরের দিন খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, জায়গিরদারের কবরে খোঁড়াখুঁড়ির দাগ, কে যেন ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছিল, পুরো ব্যাপারটা তখন বোঝা যায়।
আপনারা যে আওয়াজের কথা বলছিলেন না, ওটা সেই জায়গিরদারের কান্না, সে মাঝেই মাঝেই কেঁদে কেঁদে ওঠে, বেরিয়ে আসতে চায় হয়তো জ্যান্ত কবর থেকে কিংবা বাসন্তীআম্মার কাছে ক্ষমা চাইতে কে জানে।”
“কিন্তু মুনশিজি…” অরিত্র কিছু একটা বলতে ওঠে, আমি আটকে দিই।
“অনেক রাত হয়ে গেল কথায় কথায়, আপনাদের সকালে ওঠা আছে, শুয়ে পড়ুন, আমি বাসনগুলো নিয়ে যাচ্ছি।” মুনশিজি চলে যান।
আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে একটা চাদর জড়িয়ে বাইরে বারান্দায় চলে আসি, বাকিরা দেখলাম চুপচাপ শুয়ে পড়ল। চাঁদের আলোয় বহুদূর পর্যন্ত পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। অত্যধিক পানীয় সেবন কিংবা মুনশিজির গল্পটা, যে কোনো একটা হতে পারে, কিন্তু জঙ্গলের প্রান্তরে শুকনো নদীটার নুড়িপাথরে চাঁদের আলো লেগে এক অদ্ভুত দৃশ্য আমার চোখে ধরা পড়ল। ড্রাইভার নবীনের লজিকাল ব্যাখ্যাই হোক, কিংবা মুনশিজির দিল-লজিকাল স্মৃতিমন্থন যাই হোক না কেন, সেই চাঁদের আলোয় বহুদূরে একটা শ্বেতবসনা নারী শরীর যেন আমি দেখতে পাচ্ছি, তার বহুদিনের স্নান না করা অগোছালো চুল হাওয়ায় উড়ছে আর তার বহুকালের অভিমান ভরা চোখের জলে চাঁদের আলো লেগে চকচক করছে। নাহ্ বেশ ঠান্ডা লাগছে, শুয়ে পড়তে হবে, শব্দটা আবার শুরু হয়েছে…







