প্রজাপতি আর একটা লাশ

“আচ্ছা, তুই যে আমাকে এখন এত ভালোবাসছিস, সারাজীবন ঠিক এইভাবে ভালোবেসে যাবি তো বল?”

“হুম, কেন বাসব না।”

“তখন থেকে কী হুম হুম করছিস বলতো? ওঠ, আমার চোখের দিকে ভালো করে তাকা, সত্যি করে বল।”

“উফ্, জ্বালিয়ে খেলি তো, কেন ছুটির দিনের সকালটার এভাবে বারোটা বাজাচ্ছিস একঘেয়ে প্রশ্নবান হেনে?”

“হ্যাঁ, এখন তো আমি একঘেয়ে হয়ে যাবই, তুই এটা একদম ঠিক কথা বলেছিস।”

“ওই অমনি শুরু হল পাগলির অভিমান, আচ্ছা শিউলি তুই এরকম অবুঝ কেন বলত, তোকে ছাড়া একটা দিনও চলেছে আমার, যে ভবিষ্যতে চলবে?”

“জানি না রে, কিন্তু আজকাল আমার বড্ড ভয় করে, শুধু মনে হয় আমাদের কে যেন আলাদা করে দেবে, তোকে কেড়ে নেবে আমার থেকে।”

“ধুর বোকা, আমাদের কেউ আলাদা করতে পারবে না,

পাগলি কোথাকার একটা!”

“যা যা, আর সোহাগ দেখাতে হবে না এই সকালবেলায়… কথা বন্ধ হয়ে আসে শিউলির, তার সারা শরীর জুড়ে তখন উষ্ণ স্পর্শের জোয়ার লেগেছে।” গোঁ-গোঁ করে মাথার কাছে মোবাইলটা বেজে ওঠে, ঘুম ভেঙে যায় শিউলির।

“হ্যালো মিস সেন, আমি আবদুল বলছিলাম, ‘হ্যাঁ আজ রাত ন-টায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট কিন্তু।”

“ওকে, আমি পৌঁছে যাব আর জায়গাটা?”

“আপনাকে সব মেসেজ করে দেব আর কিছুক্ষণের মধ্যেই।”

“বেশ, তবে ফোনটা রাখলাম এখন।” উঠে পড়ে শিউলি, আয়নার সামনে সোজা হয়ে দাঁড়ায়, নিজেকে দেখে ভালো করে, কিন্তু নাহ্ পাঁচ বছর আগের সেই সহজ সরল বোকা মেয়েটাকে সে আর খুঁজে পায় না, তার সামনে এখন চাপ-চাপ মেকআপের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে, শুধুই মিস সেন।”

.

।। দুই।।

হাতের কাচের গ্লাসটা সজোরে দেয়ালে ছুড়ে মারলেন বসাক রায়, কলকাতার এক নামী আইটি কোম্পানির চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার। ব্যাপারটা এতদূর যে এগিয়ে যাবে, তিনি বুঝতে পারেননি, বুঝতে পারলে তো…

নাহ্ আর কিছু ভাবতে পারছেন না তিনি, কী করবেন? লোকটাকে একবার ফোন করবেন? নাকি নিজেই সব সামলে নেবেন, হায় ঈশ্বর!

“ভবানীপুর থানা? মেজোবাবু আছেন? একটু দিন তো? আমি রায় বলছি।”

“হ্যালো, বলুন রায়সাহেব, হঠাৎ এই অধমকে তলব, কী মনে করে?”

“ভাই, একটা বড়ো বিপদ হয়ে গেছে।”

“হ্যাঁ বিপদে না পড়লে তো কেউ তো আর আমাদের খোঁজ করে না, তা এবারেও কি মাগি কেস নাকি!”

“ভাই ইয়ার্কি না, এবারেরটা বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে, আমি কী করব বুঝতে পারছি না, মাথা কাজ করছে না, তুমি জলদি এসো, হোটেল ক্লাসিকো, রুম নম্বর ৭।”

“আচ্ছা আচ্ছা দাদা আপনি মাথা ঠান্ডা করুন, আমি আসছি।”

মোবাইলটা রেখে ধপ করে বসে পড়লেন মিঃ রায়, সারা শরীর তার কাঁপছে, বিগত একঘণ্টায় ঘটে যাওয়া দৃশ্যগুলো এক-এক করে তার মনে পড়তে থাকে।

“আজ বাকি রাতটাও থেকে যাও না ডার্লিং, তোমার তো বাড়ি ফেরার নেই, এত তাড়া কীসের তোমার?”

“কাজ তো মিটে গেছে আপনার, আমার আর প্রয়োজন কী?”

“আহ্, শুধু কী কাজের জন্য তোমাকে ডাকা বলো, তাহলে তো অন্য কাউকেও ডাকতে পারতাম, এসো না বাকি রাতটা মদ খেয়ে, উষ্ণ আলিঙ্গনে একটু গল্প করে কাটিয়ে দি।”

“সোহাগের জন্য তো বাড়ির বউ আছে, ‘আমার আজ সত্যিই শরীরটা ভালো নেই, আমাকে প্লিজ ছেড়ে দিন আজ।”

“বহুত বড়ো বড়ো কথা বলছ তো আজ, এক্সট্রা টাকা লাগবে তো? কত লাগবে আমি দিচ্ছি।”

“টাকা জীবনে অনেক কামিয়েছি, ওটা রেখে দিন রায় সাহেব, বাড়ির বউকে গয়না কিনে দেবেন।

“ওহে মিস সেন, কর্পোরেট লেবেলটা সাঁটা হয়ে গেলেও বেশ্যা কিন্তু বেশ্যাই থাকে, আর বেশ্যাদের মুখে কিন্তু এত বড়ো বড়ো কথা মানায় না।”

“বাড়িতে সতী সাধ্বী বউ ছেড়ে, বেশ্যাদের হাতে আদর খেতে আসা বাবুদের মুখেও সম্মানের কথাও কিন্তু মানায় না, এটা জানেন তো?”

“তবে রে শালি, এত বাড় বেড়েছে, তোর এত ফুটানি যে সুন্দর মুখটার জন্য, ওটাকেই আজ শেষ করে দেব, হাতের বোতলটা সজোরে শিউলির মুখের ওপর বসিয়ে দেন মিঃ রায়।”

“আআহহহ্,” ভাঙা কাচের টুকরো আর একটা আর্ত চিৎকারে ভরে যায় ঘরটা, ফিনকি দিয়ে রক্তের স্রোত নেমে আসে, কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করতে থাকে মিস সেনের গোটা শরীর। হাতের কাছে যা পান, তাই দিয়ে সজোরে মুখের ওপর আঘাত করতে থাকেন বসাক রায়, যতক্ষণ না শিউলির শরীরটা নিস্তেজ হয়ে আসে।

“রায়সাহেব, ও রায়সাহেব, আমি এসেছি, দরজা খুলুন, সম্বিৎ ফেরে বসাক রায়ের, ধড়ফড় করে ওঠেন তিনি, তবে বোধহয় মেজোবাবু এসেছে, সবটা তাকে খুলে বলতে হবে, ও শালাই পারবে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে।”

“দরজা খুলতে এগিয়ে যান বসাক রায়, পাশে পড়ে থাকে রক্ত মাখা কার্পেটে জড়ানো মিস সেনের লাশটা, তখনও বেশ খানিকটা গরম…”

.

।। তিন।।

“ওই শালা ওঠ ওঠ, যখনই দেখি তখন‍ই ঘুমাচ্ছে মড়ার মতো।”

“কী আর করব স্যার এই মৃত্যু-পুরীতে একা বসে বসে, ঘরে কিন্তু বডি রেডি করে রেখে দিয়েছি আপনার জন্য।”

“কৃতার্থ করেছ আমাকে, শালা কত কিছু দেশ-বিদেশ ভেবে রেখেছিলাম, আর এখন এই ধ্যাড়ধেড়ে গোবিন্দপুরে বসে পচা লাশ কাটতে হচ্ছে, সব কপাল কপাল!”

আজ চার বছর ধরে এক জিনিস দেখে যাচ্ছে নবীন ডোম, ডাক্তার শৌভিক সরকার মানুষ ভালো, কিন্তু রোজ মদ খেলেই কী যে হয় মানুষটার, পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে সে, বারন্দায় বড্ড মশা, আপাদমস্তক কাপড় দিয়ে ঢেকে নেয় নিজেকে। গজগজ করতে করতে এগিয়ে যান ডাক্তার সরকার, পোশাক বদলাতে শুরু করেন, হঠাৎ বিকট শব্দে একটা বাজ পড়ে বাইরে, জানলা দিয়ে ছিটকে আসা হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে চমকে ওঠেন তিনি।

মুখটা ভারী কিছু দিয়ে থেঁতলে দেওয়া হয়েছে, এতটাই খারাপ অবস্থা যে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না।

হুঁহ্, আমার কেরিয়ারের থেকে তো বেশি খারাপ অবস্থা নয়, না হলে এই ঝড়-বৃষ্টি মাথায় করে লাশ কাটতে হয়, দীর্ঘশ্বাস ফেলেন ডাক্তার সরকার, আরে ডান হাতে ওটা কী? একটা প্রজাপতির ট্যাটু; ছিটকে সরে আসেন ডাক্তার সরকার, এই ট্যাটু তিনি চেনেন, শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমেল স্রোত নেমে যায় তাঁর, তখনই বাইরে বিকট শব্দে আবার একটা বাজ পড়ে।

.

।। চার।।

একটা ভ্যাপসা ঘর, চারটে নোংরা দেয়াল, আর তার মাঝে ছোট্ট একটা খাট, তাতে ঘর্মাক্ত দুটো শরীর।

“কী রে, এটা কেমন হয়েছে বললি না তো!”

“কোনটা রে?” শিউলির বুকে মাথা রেখে প্রশ্ন করে

সরকার।

“এই যে এইটা, আমার হাতের এই ট্যাটুটা।”

“ডার্লিং, বাকি জিনিসপত্র যা বানিয়েছ, সেসব ছেড়ে কী আর হাতের দিকে মন যায় বলো?”

“ধ্যাত, তোর সবেতেই ইয়ার্কি, দেখতে হবে না তোকে যা।”

“ওয়াও, কী সুন্দর একটা প্রজাপতি রে, তো এটা শুধু স্ট্যাটিক, নাকি কিছু ফাংশানও আছে ম্যাডাম?” শিউলির নরম শরীরটাকে আরও কাছে টেনে নেয় সরকার, তার রোমশ কালো শরীরের নীচে নিষ্পেষিত হতে থাকে শিউলির গোটা শরীরটা।

.

“উফ্, কাঁপিয়ে দিয়েছে গুরু, ফাটিয়ে দিয়েছ, শালা ক্যামেরাটা যা সেট করেছিলে না, কী অ্যাঙ্গেল মাইরি, সুন্দরী বলে মাগির খুব দেমাক, শালা গেল তো ঘুচে।” দমফাটা হাসিতে কেঁপে উঠতে থাকে গোটা হোস্টেলটা।

বাকিদের সাথে হাসিতে যোগ দিয়েছিল শৌভিকও, তৃতীয় বর্ষের মেডিকেল স্টুডেন্ট, কিন্তু পাশের কলেজের নাক উঁচু সুন্দরী মেয়েটাকে বাগাতে তাকেও বেশ বাগ পেতে হয়েছিল, এতদিনে সাকসেস এসেছে, আর উপরি পাওনা এই রগরগে ভিডিয়োটা, নাহ্ রহিমের ক্যামেরাটা ছোট্ট হলেও বেশ কাজের কিন্তু।

“আমি কিন্তু তোকে সত্যিকারের ভালোবেসেছিলাম, আর তুই আমাকে বাজারি বেশ্যা বানিয়ে দিলি?” একটা আর্ত- চিৎকারে খানখান হয়ে গেছিল হোস্টেলের আমোদ, ঘরের দরজাটা দড়াম করে খুলে যায়, শিউলি এসে দাঁড়িয়েছে, তার চোখের দৃষ্টিতে ঝলসে যেতে থাকে শৌভিকের গোটা গা।

.

।। পাঁচ।।

নাআ-আ, চিৎকার করে পিছিয়ে আসেন ডাক্তার সরকার। সাত বছর আগের এক পুরানো স্মৃতি, লাশের ডানহাতের ওই ট্যাটু, সব গোলমাল হয়ে যেতে থাকে তার। পিছিয়ে আসেন তিনি, কী করবেন, নবীনকে ডাকবেন নাকি একবার? শরীরটাও কীরকম খারাপ-খারাপ করছে যেন। আজ এত বছর ধরে লাশ কাটছেন তিনি, কোনোদিন এরকম হয়নি তার, নবীনকে ডাকলে যদি সে ভীতু মনে করে! ওটা তো সামান্য একটা লাশই, প্রাণস্পন্দনবিহীন নির্জিব জড়বস্তু একটা, ওটাকে নিয়ে এত ভাবার কিচ্ছু নেই, নিজেকে মনে মনে সান্ত্বনা দিতে থাকেন ডাক্তার সরকার।

“আজ আর কেউ আসবে না তোর ডাকে সরকার, আজ শুধু তুই আর আমি, ঠিক সেই দিনের মতো।”

বিস্ফারিত চোখে দেয়ালে ছিটকে পড়েন ডাক্তার সরকার, একটু একটু করে সরে যেতে থাকে কাপড়, উঠে বসে লাশটা, “সরে যাচ্ছিস কেন শৌভিক? এই শরীরটাই তো তুই চেয়েছিলিস না? চিরতরে ক্যামেরায় ধরে রাখতে? তবে আয় কাছে আয় আমার।” হাসতে শুরু করে লাশটা।

“আমাকে ক্ষমা করে দে শিউলি, সেদিন মদের ঘোরে ভুল করে ফেলেছিলাম আমি।” চিৎকার করে ওঠেন তিনি। “ভুল? ভুল তুই কোথায় করেছিলি শৌভিক, ভুল তো করেছিলাম আমি, তোকে অন্ধের মতো ভালোবেসে, বিশ্বাস কর।”

“নাহ্, ক্ষণিকের ঝোঁকে চরম একটা ভুল আমি করে ফেলেছিলাম শিউলি, সারাজীবন তার অভিশাপ আমি বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি। তোকে কিন্তু আমি কম খুঁজিনি, তুই আমাকে ক্ষমা করে দে।” বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে ওঠেন ডাক্তার সরকার।

“খুঁজেছি তো তোকেও অনেক শৌভিক, আজ দেখা পেলাম, তুই কী ভাবছিস? তোর ডাক্তারি চোখ কী বলছে? খুন হয়েছি তো আমি? নাহহ্, আত্মহত্যা করেছি আমি, আর সেটা একদিনে নয়, দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, তিলে তিলে একটু একটু করে খুন করেছি নিজেকে, নিজের শরীরকে, নিজের আত্মাকে। তোদের মতো বড়লোক না হলেও রক্ষণশীল একটা মধ্যবিত্ত পরিবার, তাদের সবার মাথা এক ঝটকায় নামিয়ে দিতে তোর বাধেনি না? একটা মেয়ের এতদিনের ভালোবাসা, তার আশা-আকাঙ্ক্ষার পুরস্কার একটা সামান্য ভিডিয়ো শৌভিক?”

“তুই চুপ কর, আমি আর পারছি না শিউলি, আমাকে মুক্তি দে তুই।” দুহাত দিয়ে সজোরে নিজের কানদুটো

চেপে ধরেন ডাক্তার সরকার।

অ্যাঁ, কে চিৎকার করল, ডাক্তারবাবু নাকি, এ হে অনেকক্ষণ চোখ লেগে গেছে আজ, ছুটে ভেতরে যায় নবীন, আজ সে খুব ঝাড় খাবে নিশ্চয়ই। ভেতরে গিয়ে সে যা দেখে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না, টেবিলের ওপর লাশটা শোয়ানো ঠিক আগের মতোই, শুধু তার ডানহাতটা নেই। ঘরের এক কোণে বসে রয়েছেন ডাক্তার সরকার, তার ডানহাতের কবজি থেকে রক্তের ধারা নেমে এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে গোটা মেঝেটা, আর তার মুখে ধরা রয়েছে সেই কাটা হাতটা, যাতে একটা প্রজাপতি আঁকা, সেটাকে প্রাণপণে চিবিয়ে চলেছেন তিনি….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here