পিরামিডের কান্না
সূর্যের পড়ন্ত আভাতে নিজের দীর্ঘায়িত ছায়াটা প্ৰত্যক্ষ করছিলেন ফারাও হুনি। প্রভূত সম্পদ আর লোকবলের অধিকারী হয়েও, নিজেকে আজ বড্ড নিঃস্ব বোধ হচ্ছে তাঁর। সত্যিই বোধহয় সূর্যাস্তের আর বেশি দেরি নেই তাঁর জীবনে।
“হে মহানুভব আমন-রা, আমাকে শক্তি দাও প্রভু, যেন আমি তোমার মতোই এই অন্ধকারের রাস্তা পেরিয়ে আসতে পারি।”
“আমি কি ভেতরে আসতে পারি সম্রাট?”
“আসুন প্রধান পুরোহিত হোরাস।”
“হে মহানুভব, যদি অভয় দেন, আমি কি একটা অনুরোধ করতে পারি?”
“অবশ্যই করতে পারেন হোরাস, কিন্তু আপনি ভালো করেই জানেন, সে অনুরোধ রাখা আমার পক্ষে সম্ভব না।”
“হে প্রভু, রাজকুমার রামোসিস কিন্তু এখনও যথেষ্টই ছোটো, অন্তত ওনার কম বয়সের কথা ভেবে, লঘু দণ্ড কী দেওয়া যায় না?”
প্রধান পুরোহিত হোরাস-এর প্রশ্নের উত্তরে মাথা নাড়লেন ফারাও হুনি।
“আমি প্রথমে সম্রাট তার পরে পিতা, প্রথমে আমার দেশ, তারপরে আমার সন্তান, আর জ্ঞানত হোক আর অজ্ঞানতই হোক, দেশের প্রতি সামান্যতম বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি একটাই, আপনি জীবন্ত সমাধির প্রস্তুতি নিন পুরোহিত, আজ রাতের মধ্যেই যেন সব কাজটা শেষ হয়।”
প্যাপিরাসের বাকি পাতাগুলো বড্ড জীর্ণ, এর পর আর পড়া যায় না, চোখের ওপর বড্ড স্ট্রেস পড়ে। ফাইলখানা অতি সন্তর্পণে রেখে উঠে পড়ে রবার্ট। পেছনে একটা শব্দ পেয়ে সে ঘুরে দেখে, ডক্টর জেমস ফ্রাঙ্কলিন বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
“আপনি কি কোথাও যাচ্ছেন বাবা?”
“সেই কৈফিয়ত তো, তোমাকে আমি দেব না, এ প্রশ্ন করার অধিকার তুমি অনেকদিন হল হারিয়েছ।” মাথা নীচু করে ফেলে রবার্ট, সত্যই তো সে অধিকার সে হারিয়েছে।
ইংল্যান্ড থেকে দুটো দল এসেছিল ফারাও হুনির পিরামিডের খননকার্য করতে, দুটো দলই সিমুলটানিয়াসলি কাজ করে চলছিল। একটি দলের নেতৃত্বে ছিলেন মিশর স্কলার ডক্টর ব্যারন স্মিথ, আর একটি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন রবার্টের পিতা ডক্টর জেমস ফ্রাঙ্কলিন নিজে। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ফারাও হুনির সমাধি চেম্বারটি পাওয়া যায়নি, সবাই প্রায় হতাশ হয়ে পড়েছিল।
হঠাৎ একদিন রবার্ট আর ডক্টর ফ্রাঙ্কলিন পিরামিডের মধ্যে একটি গোপন প্রকোষ্ঠ খুঁজে পান, যেটা সবার নজর এড়িয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সেদিন রাত অনেকটাই বেশি হয়ে যাওয়ায় ওঁনারা ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। ডক্টর ফ্রাঙ্কলিন ভেবেছিলেন পরের দিন দিনের আলো ফুটতেই সবাই অলক্ষ্যে রবার্টকে সাথে নিয়ে সেই প্রকোষ্ঠে তিনি প্রবেশ করবেন, আর কে বলতে পারে হয়তো ফারাও হুনির সমাধিক্ষেত্রটা সেখানেই পাওয়া যাবে। তিনি ভেবেছিলেন সবাইকে চমক দেবেন, আসলে প্রথম আবিষ্কারক হিসেবে ইতিহাসের সঙ্গে নিজের নাম জড়াতে কে না চায়! কিন্তু সেখানেই ঘটে যায় এই সর্বনাশটা। ঘটনাচক্রে দীর্ঘদিন একসাথে কাজের সুবাদে, ডক্টর ব্যারন স্মিথের মেয়ে জুলির সাথে রবার্টের কিছুটা ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। তাই সেদিন রাতে পিরামিড থেকে ফিরে রবার্ট আবেগের আতিশয্যে জুলিকে বলেই ফেলেছিল গোপন প্রকোষ্ঠের কথা।
আর ব্যস, পরের দিন সকালবেলা ডক্টর ফ্রাঙ্কলিন আর রবার্ট সেই গোপন প্রকোষ্ঠে পৌঁছানোর আগেই দেখেছিলেন, ডক্টর ব্যারন স্মিথ তার লোকলশকর নিয়ে সেখানে পৌঁছে গেছেন আর ইতিহাসের খাতায় নিজের নাম অমর করে নিয়েছেন। নিজের কৃতকর্মের জন্য আজও অত্যন্ত অনুশোচনা হয় রবার্টের, কিন্তু কিছু করার নেই, অতীত তো সে আর ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
সেদিন থেকেই নিজের ছেলেকে প্রায় ত্যাজ্য করেছেন ডক্টর জেমস ফ্রাঙ্কলিন। কিন্তু এইভাবে রোজ রাতের অন্ধকারে ডক্টর ফ্রাঙ্কলিনের তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে যাওয়াটা মেনে নিতে পারে না রবার্ট।
“এভাবে একা একা বাইরে বেরিয়ে যাবেন না বাবা, বাইরে কতরকমের বিপদ-আপদ থাকতে পারে।”
“তোমার মতন ঘরের বিপদ থাকলে বাইরের বিপদ আমাকে স্পর্শও করতে পারবে না রবার্ট।”
“আমি জানি আপনি আমায় কোনোদিনও ক্ষমা করতে পারবেন না, কিন্তু অন্তত এটুকু বলে যান, এই গভীর রাতে এ ধুধু মরুভূমি বুকে আপনি কোথায় যান?”
“কেন আবার যাতে তুমি তোমার সেই বিছানার সস্তা বেশ্যার কাছে নতুন একটা গল্প শোনাতে পারবে?” তাঁবু ছেড়ে হনহন করে বেরিয়ে যান ডক্টর জেমস ফ্রাঙ্কলিন।
ল্যাম্পের ঘোলাটে আলোতে ডক্টর ফ্রাঙ্কলিনের চলে যাওয়া ছায়াটা অনেকটা, ৪০০০ বছর আগে ঘটে যাওয়া ফারাও হুনির কিংকর্তব্যবিমূঢ় সেই রাতের কথা মনে করিয়ে দেয় রবার্টকে, সেদিনও এক পিতা তার সন্তানকে নির্মম শাস্তি দিতে গেছিলেন।
কিন্তু এভাবে আর ওনাকে একা একা ছেড়ে দেওয়া উচিত হবে না, সন্তর্পণে তাঁবু ছেড়ে বেরিয়ে আসে রবার্ট। নিঃশব্দে ডক্টর ফ্রাঙ্কলিনকে অনুসরণ করতে থাকে সে।
ফারাও হুনির পিরামিডটাকে দূরে ছেড়ে, আরও দক্ষিণে এগিয়ে যেতে থাকেন ডক্টর ফ্রাঙ্কলিন। বুড়ো মানুষটা এ অন্ধকার বালির সমুদ্রে কোথায় এগিয়ে চলেছে, ভাবতে থাকে রবার্ট। রীতিমতো এবার ভয় লাগতে শুরু করে তার। হঠাৎ ডক্টর ফ্রাঙ্কলিন থেমে যান, সতর্কভাবে চারপাশটা চোখ বুলিয়ে দেখেন। আর তারপর হাতের ব্যাগ থেকে কী যেন একটা বের করে আনেন, যেটা তখনও ঝটপট করে চলেছে।
হা ঈশ্বর, ওগুলোতে ক্যাম্পে রান্না করার জন্য রাখা কালো মুরগিগুলো, ওগুলো নিয়ে কী করছেন বাবা?
সোঁ-সোঁ শব্দে হাওয়া ছোটে, নীলচে চাঁদের আলোয় ঝকমক করে ওঠে বালিকণা। একটার পর একটা মুরগির গলা কেটে, তাদের গরম রক্ত তপ্ত বালির বুকে ছড়িয়ে দিতে থাকেন ডক্টর ফ্রাঙ্কলিন।
বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ রবার্ট, স্তব্ধ হয়ে দেখতে থাকে সে নারকীয় কাণ্ডকারখানা… আকাশের বুক থেকে এক ঝাঁক অজানা কালো পাখির দল নেমে এসে কীভাবে সেই রক্তমাখা বালি পরিতৃপ্তির সাথে খুঁটে চলেছে, আর পাগলের মতো দুর্বোধ্য ভাষায় কী যেন একটা মন্ত্র আউড়ে চলেছেন ডক্টর জেমস…
.
।। দুই।।
দুঃস্বপ্ন দেখতে দেখতে চোখদুটো কখন লেগে গেছিল কে জানে, পিঠের ওপর একটা হাতের খোঁচা খেয়ে ধড়ফড় করে বিছানার ওপর উঠে বসে রবার্ট। দেখে সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, ডক্টর জেমস ফ্রাঙ্কলিন। ক্যাম্পের নীলচে নাইট ল্যাম্পের আলোয়, খননকার্যে যাওয়ার ড্রেসে সুসজ্জিত ডক্টর ফ্রাঙ্কলিনকে ভারি অদ্ভুত দেখাচ্ছিল।
“চলো রেডি হয়ে নাও, বেরোতে হবে।” হিসহিসিয়ে বললেন ডক্টর ফ্রাঙ্কলিন।
“এখন এই এত গভীর রাতে? কোথায় যেতে হবে বাবা?” গভীর বিস্ময়ে প্রশ্ন করে রবার্ট।
“অপদার্থ হলেও তুমি সন্তান তো আমারই, তাই পিতা হিসেবে একটা দায়িত্ব থেকেই যায়। আমি বোধহয় রামোসিসের সমাধিক্ষেত্রের সন্ধান পেয়েছি।”
রামোসিস, মানে সেই ফারাও হুনির একমাত্র বিস্মৃত সস্তান, যাকে তিনি দেশদ্রোহের অপরাধে জীবন্ত সমাধি দিয়েছিলেন! কিন্তু কোথাও তার পিরামিড বা সমাধিক্ষেত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিস্ময়ে চিৎকার করে ওঠে রবার্ট।
“অবুঝের মতো চিৎকার করছ কেন? ক্যাম্পের বাকি লোকেরা জেগে গেলে সেই আগের হাল হবে, তুমি আমার সাথে নিঃশব্দে চলে এসো, আমার একার পক্ষে পিরামিডের সেই রাস্তায় একা প্রবেশ সম্ভব নয়।
“কিন্তু এত রাতে কেন বাবা? কাল ভোরে গেলে হয় না?”
“মূর্খ, সেই রাস্তা একমাত্র রাতেই খোলা থাকে, তোমার একবারও মনে হচ্ছে না, যে এই ক্যাম্পের শয়ে শয়ে লোকের সামনে এরকম একটা পথ অদেখা থেকে গেল কীভাবে?”
“হ্যাঁ তা তো মনে হচ্ছেই।” মাথা নাড়ে রবার্ট।
“কারণ আমি মহানুভব আনুবিসকে প্রসন্ন করেছি, উনিই আমাকে এই রাস্তা দেখিয়েছেন, আর কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না এ পথ খোঁজা।”
আর কথা না বাড়িয়ে রবার্ট পোশাক বদলাতে থাকে। সে বুঝতে পারে, এই মুহূর্তে ডক্টর ফ্রাঙ্কলিনকে বুঝিয়ে আর লাভ নেই, অবশ্য তার নিজের মনেও যে কৌতূহল দানা বেঁধেছে এ কথা বলাই বাহুল্য।
.
।। তিন।।
হঠাৎ করে একটা পাথরের দেয়ালে এসে পথটা শেষ হয়ে গেছে। রবার্ট এখনও নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না, কীভাবে ডক্টর ফ্রাঙ্কলিনের সাথে অন্ধকার বালুকারাশির বুকে একটা গর্তের মুখে সে নেমে পড়েছিল, আর তারপরেই একটা সুড়ঙ্গ, যেটা সোজা গিয়ে শেষ হয়েছে ফারাও হুনির পিরামিডের গায়ে, কীভাবে এতটা রাস্তা সে এল, এখনও ভাবলে তার গায়ে শিহরন জাগছে। “এটাই সেই ফাইনাল দরজা।” মুচকি হাসলেন ডক্টর ফ্রাঙ্কলিন।
নিজের হাতের লাইটটা রবার্টকে ধরতে দিয়ে, পকেট থেকে একটা অদ্ভুত দর্শন গোলাকার পাথর বের করে আনলেন তিনি
“আসলে কী জানো রবার্ট, হুনি ফারাও হলেও, আমার মতো পিতাও তো ছিলেন, তাই শত অপরাধেও সন্তানকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেননি। তিনি জানতেন তাঁর মৃত্যুর পরেই রামোসিসের সমাধি ঘিরে দেশবাসীর ঘৃণার আচরণ শুরু হতে পারে, তাই তাঁর নির্দেশে হুনিরই পিরামিডের একটা গোপন প্রকোষ্ঠে রামোসিসের মমিকে এনে রাখা হয়।”
“কিন্তু আপনি এসব কী করে জানলেন?” রবার্ট প্রশ্ন করে।
“তুমিও জানতে পারতে, যদি না প্যাপিরাসের শীর্ণ পাতাগুলো ওই বেশ্যার থেকে তোমার কাছে বেশি গুরুত্ব পেত।”
মাথা নীচু করে নেয় রবার্ট।
ডক্টর ফ্রাঙ্কলিন হাতের সেই পাথরটা দিয়ে সামনের দেয়ালের একটা গোলাকার ছিদ্রে ঢুকিয়ে ঘুরিয়ে দেন। রাতের নীরবতা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে সামনের দেয়ালটা সরে যায়। শত-সহস্র বছরের জমে থাকা ইতিহাস, এক ঝটকায় যেন ছিটকে আসে, আছড়ে পড়ে তাঁদের দুজনের ওপরে।
“চলো যাওয়া যাক।” মুচকি হাসেন ডক্টর ফ্রাঙ্কলিন।
কাঁপা কাঁপা হাতে তাঁর হাতে লাইটটা ধরিয়ে দেয় রবার্ট।
এতগুলো অদ্ভুত ঘটনা দেখার পর, ডক্টর ফ্রাঙ্কলিন নিজের বাবা না হলে এতক্ষণে রবার্ট সত্যিই দৌড়ে পালাত এ-কথা বলাই বাহুল্য। দেওয়ালের পরেই একটা সরু প্যাসেজ, সেটা দিয়ে কিছুটা যাওয়ার পরেই একটা চৌকো ঘর পড়ল, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে আনুবিসের এক বিশাল মূর্তি। আর তার সামনেই একটা উঁচু বেদির ওপরে একটা সমাধি রাখা।
“রামোসিস!”
অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে রবার্ট।
পিতাপুত্র দুজনেই এসে হাঁটুগেড়ে বসে পড়ে সেই জীবন্ত ইতিহাসের সামনে।
“আহ্ সর্বনাশ, এতটা ভুল করলাম কী করে?”
“কী ভুল করলেন বাবা?”
“উত্তেজনার আতিশয্যে টুলবক্সটাই আনা হয়নি।” বিরক্তি প্রকাশ করলেন ডক্টর ফ্রাঙ্কলিন।
“আমি গিয়ে নিয়ে আসব?”
“তুমি পারবে না এই রাস্তায় একা যাতায়াত করতে, তুমি ওয়েট করো এখানে, আমি নিয়ে আসছি।”
নীরবে মাথা নাড়ে রবার্ট।
ডক্টর ফ্রাঙ্কলিন চলে যান।
হঠাৎ একটা ঘড়ঘড় শব্দে কী যেন একটা সরে যায়। রবার্টের মনের মধ্যে আশঙ্কার একটা মেঘ দানা বাঁধতে শুরু করে, সে দৌড়ে যায় সরু প্যাসেজ ধরে। কিন্তু ততক্ষণে অনেকটা দেরি হয়ে গেছে, সে কালদরজা আবার বন্ধ হয়ে গেছে।
“বাবা, বাবা? তুমি এটা কী করছ আমার সাথে?” চিৎকার করে পাথরের দেয়ালের ওপর আছড়ে পড়ে রবার্ট।
“যেটা করা উচিত, জীবন্ত সমাধি, রামোসিসের মতোই, তোমারও অপরাধের শাস্তি এটাই।” দেয়ালের ওপাশ থেকে ডক্টর ফ্রাঙ্কলিনের গলা ভেসে আসে।
পাগলের মতো হাসতে হাসতে তিনি সুড়ঙ্গপথ ধরে এগোতে থাকেন, উফ্ নিজেকে ফারাও হুনির মতো মনে হচ্ছে যেন, দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন। সেই রাতের কঠিন কঠোর ফারাওয়ের মুখটা বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল তাঁর। কিন্তু তিনি তো ফারাও হুনি নন, তিনি ডক্টর ফ্রাঙ্কলিন, ইতিহাসের একজন নিষ্ঠাবান ছাত্র হয়েও, সেই একই ঐতিহাসিক ভুল তিনি করতে চলেছেন কীভাবে? সম্বিৎ ফিরে আসে তাঁর, কত বড়ো ভুল করতে চলেছিলেন তিনি, যত অপরাধই করুক, রবার্ট যে তাঁর নিজের সন্তান, নিজের রক্ত।
আবার ফিরে চলেন ডক্টর ফ্রাঙ্কলিন, ভুলটা শুধরে নিতে হবে।
ওই তো সেই দেয়াল, তার ভেতরেই রয়েছে রবার্ট, রবার্টকে বুকে জড়িয়ে ক্ষমা চেয়ে নেবেন তিনি, সে কি ক্ষমা করবে না এই বৃদ্ধ বাপটাকে!
হঠাৎ করে বুকে প্রচণ্ড যন্ত্রণা শুরু হয় ডক্টর ফ্রাঙ্কলিনের, শরীরে বামদিকটা কেমন যেন অবশ হয়ে আসতে থাকে, তিনি অনেক চেষ্টা করেন গোলাকার চাকতি দিয়ে সেই পাথরের দেয়ালটাকে আবার খুলে ফেলতে, কিন্তু পারেন না। ধপ করে বালির মধ্যে মুখ গুঁজে পড়ে যায় ডক্টর ফ্রাঙ্কলিনের নিস্পন্দ শরীরটা।
.
।। চার।।
ক্রমাগত দেয়ালের ওপর ঘুসি-লাথি চিৎকার করতে করতে অবসন্ন হয়ে পড়ে রবার্টের শরীর। হাতের লাইটটাও ক্রমশ নিভে আসতে থাকে, তার জীবনপ্রদীপের মতোই। দেয়ালের সামনেই শুয়ে পড়ে রবার্ট, অন্তিম পরিণতির জন্য সে প্রস্তুত। হঠাৎ খসখস করে একটা শব্দ আসে, কে যেন হাঁটছে, তবে কি বাবা ফিরে এল তাকে উদ্ধার করতে?
কিন্তু শব্দটা যে আসছে পিরামিডের ভেতর থেকে!
বিস্ময়ের আরও কিছুটা বোধহয় রবার্টের জন্য বাকি ছিল। সে দেখে, তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে আনুবিসের বিশাল কালো মূর্তিটা। অন্যসময় হলে রবার্ট বোধহয় এ দৃশ্য দেখে স্থির হয়ে এভাবে শুয়ে থাকতে পারত না। কিন্তু আজ রবার্টের আর কোনো উপায় নেই, সে যাবেই বা কোথায়, তাই নিস্পলকে সেই দৃশ্যটা দেখতে থাকে। সেই ভীষণ কালো মূর্তিটা, রবার্টকে দুহাত দিয়ে আলতো করে কোলে তুলে নেয়। ঘড়ঘড় শব্দে সেই কালো দেয়াল আবার সরে যায়, মুক্তির বাতাস এসে স্পর্শ করে রবার্টের শরীরকে
সুড়ঙ্গ বেয়ে সেই মূর্তিটা হেঁটে চলে। চাঁদের আলোয়, আনুবিসের চোখদুটো চকচক করতে থাকে, সেই চোখ দুটো বড্ড চেনা লাগে রবার্টের, যেন কোথায় সে তাদের দেখেছে।
মনে পড়ে যায় রবার্টের, সে চোখ দুটো আর কারও নয়, তার বাবা ডক্টর জেমস ফ্রাঙ্কলিনের, তবে সেখানে বহুদিন বাদে রবার্ট নিজের জন্য ঘৃণা নয়, বরং স্নেহের আশ্রয় দেখতে পাচ্ছে তার জন্য…।







