কুইট্‌ ইন্ডিয়া

ও-টি-আর-এর একখানি প্যাসেঞ্জার গাড়ি আসিতেছে গোরক্ষপুরের দিক থেকে। ভিড় যথেষ্ট আছে, তবে প্রথম শ্রেণীর কামরাটা একেবারে খালি, মাত্র আমি আছি আর একটি ইংরাজ যুবতী; ইংরাজ বলিয়াই যুবতী বলিলাম, বয়স প্রায় সাতাশ-আটাশ হইবে। গোটা-দুই স্টেশন একত্রে আসার পর তিনি একটু গল্পপ্রবণ হইয়া উঠিলেন।

অনেকগুলি কারণ ছিল; প্রথমত অন্য সঙ্গীর অভাব, দ্বিতীয়ত আমি সামরিক পোশাক পরিহিত, সুতরাং অতটা অপাঙ্ক্তেয় নই, তৃতীয়ত, যাহা কথাবার্তায় টের পাইলাম, তিনি সদ্য বিলাত হইতে আসিয়াছেন, এ দেশটা সম্বন্ধে কৌতূহলও টাটকা আর এখনো কৃষ্ণবিদ্বেষটা উগ্র হইতে পায় নাই। নাম বলিলেন মিস ফ্লোরা গ্রেস। ছাপরার কাছাকাছি একটা জায়গায় কে একজন মিস্টার ট্রেভার কিছু জমিদারি এবং কৃষিসম্পত্তি লইয়া আছেন, তাঁহারই সাক্ষাৎকারে যাইতেছেন। মিস গ্রেস নিজে মাস কয়েক হইল দেরাদুনের নিকটবর্তী কোনো একটি জায়গায় একটি ইংরাজ বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা লইয়া আসিয়াছেন। মিস্টার ট্রেভার সম্প্রতি সেখানে শৈলবিহারে গিয়াছিলেন, আলাপ হয়, নিমন্ত্ৰণ রাখিয়া আসিয়াছিলেন

অর্থাৎ কোর্টশিপ চলিতেছে। আন্দাজের কথাটা আমিই বলিলাম, তবে অত স্পষ্ট করিয়া নয়। একটু হাসিয়া বলিলাম—“মিস্টার ট্রেভারের সৌভাগ্যে তাঁকে অভিনন্দিত করছি যে, এই নিদারুণ গ্রীষ্ম অগ্রাহ্য করে আপনি তাঁর নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাচ্ছেন।”

মিস গ্রেসের হাসিতে একটু লজ্জা জড়াইয়া পড়িল, বলিলেন—“কিন্তু আমি তাঁর সৌভাগ্যকে প্রীতির চক্ষে দেখতে পাচ্ছি না মিস্টার মুখার্জি—যদি সৌভাগ্যই হয় সেটা,—উঃ, কী অসহ্য গরম— নরক একেবারে!”

সত্যই অসহ্য গরম। জুন মাস, তার সময়টাও দুপুরের কাছাকাছি; পাখা চলিতেছে—কেন যেন অদৃশ্য আগুন লইয়া দেওয়ালীর আঁজি-বাঁজি দেখিতেছি। বলিলাম—“কিন্তু মাস্টার ট্রেভারেরই তো এই সময় শৈলনিবাসে থাকা উচিত ছিল, তা না করে আপনাকে সুদ্ধ এই অগ্নিপরীক্ষায় টানলেন যে?”

মিস গ্রেসের মুখটা গম্ভীর হইয়া গেল, জানালার দিকে ফিরাইয়া লইয়া নিরুত্তর হইয়া বসিয়া রহিলেন। বেশ একটু অপ্রস্তুত হইয়া গেলাম, কিছু বেফাঁস হইয়া গেছে নাকি? অথচ আসল যেখানে ঠাট্টা করিলাম সেখানে তো বিরক্তির কোনো লক্ষণই দেখা গেল না, বরং ইঁহারা বেশ সময়মতো ঠাট্টাগুলা যেমন প্রীতিভরেই গ্রহণ করেন, সেইভাবেই করিলেন গ্রহণ। কিছু বলিয়া সামলাইতে যাওয়া ঠিক হইবে কিনা, ভাবিতেছি, এমন সময় মিস গ্রেস মুখটা আবার ফিরাইয়া আনিলেন। রাগ নয়—কপট রোষের অভিনয় করিয়া বলিলেন—“শুনুন মিস্টার মুখার্জি, সত্যি কথাটা যদি বলতেই হয়, এ জন্যে দায়ী আপনারাই।”

একটু হাসিয়া প্রশ্ন করিলাম—“কি করে তা জানতে পারি কি?”

“সব দিক দিয়েই, একটু ভেবে দেখলেই বুঝতে পারবেন। আমরা আপনাদের যা শান্তি আর স্বচ্ছন্দতা দিয়েছি, তার বদলে আপনারা আমাদের শান্তি হরণ করতে বসেছেন। বেশি দিনের কথা নয় যে আপনাদের স্মৃতিপথ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে,—এই কিঞ্চিদধিক শ দেড়েক বৎসর—একবার ভেবে দেখুন কি অবস্থা ছিল এই দেশের—যুদ্ধবিগ্রহে দেশ ছিন্নভিন্ন, প্রতিটি রাজদরবার চক্রান্তের কেন্দ্র, রাস্তাঘাট নেই বললেই চলে, যা বা আছে দিনে ব্যবহারের জন্যও নিরাপদ নয়, যানবাহন সেই আদম ঈভের সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়—আপনারা যে জগতের সব পুরাতন জাতিদের অন্যতম এ কথা আমরা অস্বীকার করি না, কিন্তু যে-অবস্থায় আপনারা ছিলেন, তখন তাতে আফ্রিকা বা অস্ট্রেলিয়ার আদিম জাতিদের চেয়ে খুব বেশি প্রভেদ ছিল না। এর জায়গায় আমরা কি দিয়েছি একবার ভেবে দেখুন মিস্টার মুখার্জি—শক্তিমান কেন্দ্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত করে প্রথমত দরবারে দরবারে চক্রান্ত আর পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহের নিরসন করেছি। রাস্তাঘাট এখন সুগম এবং সম্পূর্ণ নিরাপদ, যানবাহনে আপনারা বোধ হয় পৃথিবীর সভ্যতম জাতির সমকক্ষ—সভ্যতা আর কৃষ্টির দিক দিয়েও দেখুন— আমাদের প্রবর্তিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি আপনাদের কবি, বৈজ্ঞানিক জগতের শ্রেষ্ট পুরস্কার নোবেল প্রাইজ পর্যন্ত অর্জন করে নিয়ে এসে আপনাদের দেশকে গৌরবান্বিত করেছেন। অল্পাধিক দেড় শতাব্দীর ব্যবধানের ভারতবর্ষের এই দুটি রূপ, অথচ আজ আপনারা এইভাবে তোয়ের হয়ে নিয়ে আমাদেরই উল্টে বলছেন—’কুইট্ ইন্ডিয়া!’ আমার রূঢ়তার মাপ করবেন মিস্টার মুখার্জি, কিন্তু একটা কথা জিগ্যেস করি—অকৃতজ্ঞতা কি এর চেয়ে বেশি দূর যেতে পারে?”

দেখিলাম সংযমের জ্ঞান যথেষ্ট থাকিলেও মিস গ্রেস উত্তেজিত হইয়া উঠিয়াছেন। বেশ ফাঁপরে পড়িলাম—স্ত্রীলোক, তার গাড়ির মধ্যে নিঃসঙ্গ, ওঁর বাঁধা গতের মতো তর্কগুলার উত্তর দিতে তো পারিলাম না, এমন কি নোবেল প্রাইজ পাওয়া লইয়া যে সাংঘাতিক ভ্রান্ত ধারণা রহিয়াছে সেটাও দূর করিতে কেমন যেন একটা দুরূহ সঙ্কোচ বোধ হইল। ঠাণ্ডা করিবার জন্যই বলিলাম—“একটা জাত স্বাধীনতার জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে মিস গ্রেস—তাদের দোষত্রুটি বা আতিশয্যগুলো আপনাদের মতো স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষের একটু ক্ষমার চক্ষেই দেখা উচিত নয় কি?”

মনটা বোধ হয় একটু ভিজিয়া থাকিবে, কেননা মিস গ্রেস আরো কহিলেন একটু নরম সুরেই, কিন্তু বলার সঙ্গে সঙ্গে আবার সেইরকম উত্তেজিত হইয়া উঠিলেন— হয়তো একটু বেশিই, বলিলেন— “তর্কের খাতিরে আপনার কথাটা মেনে নিলেও এটা আপনাকে খোলাখুলি জানিয়ে দেওয়াই ভালো মনে করি মিস্টার মুখার্জি যে, আপনারা একটা ধুয়ো তুলেছেন বলেই যে আমরা এদেশ ছেড়ে চলে যাব এটা আপনারা যেন স্বপ্নেও না ভাবেন। আপনাদের গলার জোর থাকতে পারে কিন্তু তর্কের মধ্যে কোনো জোরই নেই। আর আমাদের জাত যদি কোনো জিনিসকে মর্যাদা দিতে অভ্যস্ত থাকে তো তর্কের সারবত্তা, কণ্ঠের শক্তি নয়। কণ্ঠশক্তি নিয়োগ করার মধ্যে একটিমাত্র উদ্দেশ্য থাকতে পারে মিস্টার মুখার্জি, ভয় দেখানো; যে জাত নিজের শক্তি আর অধ্যবসায়ের গুণে অর্ধেক পৃথিবীতে তার উপনিবেশ স্থাপন করলে সে কি এতই ভয়প্রবণ যে আপনাদের গলাবাজিতেই তাদের অধিকার ছেড়ে পালিয়ে যাবে?”

একটু না টুকিয়া পারিলাম না, তবে যতটা সম্ভব রমণীশ্রুতির উপযোগী করিয়াই বলিলাম—“মাপ করবেন মিস গ্রেস—পৃথিবীতে আপনাদের সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য। জাতি হিসাবে সবচেয়ে বড় বিধানদাতা (Lawgiver) বলে আপনাদের একটা খ্যাতিও আছে—তাই জিগ্যেস করছি অধিকার জিনিসটা এল আপনাদের কোথা থেকে? আপনি বিদুষী,—অধিকারের মূলে যা যা থাকে তা তো নিশ্চয় আপনার অজ্ঞাত নয়…’

উল্টা ফল হইল, মিস গ্রেস একরকম অসংযত হইয়াই উঠিলেন, মুখ একেবারে সিঁদুরবর্ণ হইয়া উঠিল, ওষ্ঠাধর মাঝে মাঝে কাঁপিয়া উঠিতে লাগিল, যে তর্কের সারবত্তার ওপর এত শ্রদ্ধা তাহার ধার দিয়াও না গিয়া বলিলেন—“দেখুন মিস্টার মুখার্জি, অধিকার সম্বন্ধে পাঠ আমাদের অন্যের কাছ থেকে নিতে হবে না, সে জ্ঞান আমাদের যথেষ্টই আছে এবং আমাদের কি করে রক্ষা করতে হয় তা আমরা ভালোরকমই জানি। তাহলে কথাটা আরো একটু স্পষ্ট করেই বলি—মিস্টার ট্রেভার আর আমার মধ্যে বাগদান হয়ে গেছে। কংগ্রেস গবর্নমেন্ট ফিরে আসায় আবার ‘কুইট ইন্ডিয়া’ রব ওঠায় এবং আপনি যে ওই অধিকারের কথা বললেন, সে প্রশ্ন নিয়েও চারিদিকে গুলতান ওঠায় তাঁকে তাড়াতাড়ি এই অগ্নিকুণ্ডে নিজের জমিদারিতে ফিরে আসতে হয়েছে। আশা ছিল যুক্তির জয় হবে, তা তাঁর যে কখানি চিঠি পেয়েছি তার প্রত্যেকটিতেই এই খবর যে, অবস্থা দিন দিনই খারাপ হয়ে উঠেছে। শেষে আমি পর্যন্ত অতিষ্ঠ হয়ে এই চলেছি। কেন তা আন্দাজ করতে পারেন?”

দীর্ঘ উচ্ছ্বাসে বেশ বিপর্যস্তই হইয়া পড়িয়াছিলাম, বলিলাম—“আজ্ঞে না, কই আন্দাজ করতে পারছি না তো কিছু।”

অর্থাৎ এবার ভালোমন্দ কিছুই বলিলাম না, যদি এভাবেই উত্তাপটা কমে। কিছু না। মিস গ্রেস এবার দৃষ্টিতে খানিকটা শাসনের ভাব মিশাইয়া বলিলেন—“ইংরাজ রমণী হিসাবে আমি তাঁর বিপদে তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়াতে যাচ্ছি মিস্টার মুখার্জি, কিন্তু আমার মনের মধ্যে একটা সঙ্কল্প নিয়ে—যদি তিনি ভয়ে বা অন্য কোনো কারণে এদের অন্যায় আবদারে নিজের অধিকার ছেড়ে সরে দাঁড়ান তো তাঁকে আরো একটি জিনিসের মায়া ছাড়তে হবে…”

মিস গ্রেস আমার সপ্রশ্ন দৃষ্টির দিকে চাহিয়া থাকিয়া বলিলেন—“অর্থাৎ আমার; আমি যাচ্ছি, হয় আমাদের এনগেজমেন্ট দৃঢ় করে আসব, নয় একেবারেই চিরতরে ভেঙে দিয়ে আসব। ভীরুতাকে প্রশ্রয় দেওয়ায় আমি অভ্যস্ত নই। আপনাদের অধিকার আমাদের চেয়ে যে বেশি, তা সাব্যস্ত করতে হলে আমরা খুব বিশ্বাসজনক প্রমাণ চাই মিস্টার মুখার্জি; যদি মনে করেন, মুখে ‘কুইট্ ইন্ডিয়া’ বললেন, আর আমরা তল্পিতল্পা বেঁধে…”

এমন সময় গাড়িটা একটা স্টেশনে আসিয়া পড়িল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের কামরায় যেন একটা বিপর্যয় ঘটিয়া গেল। গাড়ির দুই পাশে দোরজানালা দিয়া দুইটা যাত্রীদল পিল পিল করিয়া ঢুকিয়া পড়িয়া গাড়িটা একেবারে ভর্তি করিয়া ফেলিল—কেহ নিজের শক্তিতে উঠিল, কাহাকেও ভিতর থেকে টানিয়া তুলিল, কাহাকেও বাহির হইতে ঠেলিয়া তুলিল; নানা রকমের ছোটবড় জিনিসপত্র আসিয়া যেখানে সেখানে পড়িতে লাগিল এবং মিনিট দুয়েকের মধ্যে অমন যে খালি কামরাটা তাহাতে তিল ফেলিবার ঠাঁই অবশিষ্ট রহিল না। ছোট স্টেশন, ইতিমধ্যে ট্রেনটা হুইস্‌ল দিয়া ছাড়িয়া দিল এবং গোলমাল যে হইতেছিল, সেটাকে ছাপাইয়া ভিতর এবং বাহির থেকে একটি চিৎকার উঠিল—“বর ওঠেনি—বর ওঠেনি!…বর ছেড়ে গেছে!”

কয়েকজন দুই ধার থেকে অ্যালার্ম চেন টানিয়া ধরিল এবং গাড়িটা ভালো করিয়া থামিবার পূর্বে দুই দিকের জানালা গলিয়া দুইটি বর দুই দিক হইতে হাতে-হাতে, পাঁজায় পাঁজায় গাড়ির মাঝখানে আসিয়া পড়িল। গাড়ি আবার ছাড়িতে যেটুকু বিলম্ব হইল তাহাতে সবাই আরো কতকগুলা লোককে গাদিয়া গাদিয়া দুই দিক হইতে চালান করিয়া দিল।

মিস গ্রেস একবারে হতভম্ব হইয়া গেছেন; খানিকটা যে ভীতও, সেটা বেশ বোঝা যায়। অত যে উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিয়াছিলেন, মুখে একেবারে রা নাই। শুধু বিস্ফারিত নেত্রে সব দেখিয়া যাইতেছেন। ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি তাঁহাকে কোণের জায়গাটিতে বসাইয়া নিজে পাশে বসিয়াছি এবং মাঝখানে আমাদের দুইজনের সুটকেস রাখিয়া একটা অন্তরালের সৃষ্টি করিয়া দিয়াছি। এতক্ষণ ভিতরের ব্যাপারই লক্ষ করিতেছিলেন, গাড়িটা একটু অগ্রসর হইলে একবার বাহিরের দিকে মুখ বাড়াইয়া ত্ৰস্ত কণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন—“মিস্টার মুখার্জি, একবার বাইরে চেয়ে দেখুন! এ কি! এমন দৃশ্য তো জীবনে দেখিনি!…

VIDEO | ভিডিও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

তোমার জন্য - গল্প

ভাড়া