দীননাথ বেগুনী লুঙ্গিখানি পরিয়া বাহিরের রকে ইজিচেয়ারে হেলান দিয়া তৃপ্তমনে গড়গড়া সেবন করিতেছিলেন, এমন সময় বাল্যবন্ধু আশুতোষ আসিয়া উপস্থিত হইলেন। পাশেই একখানি ডেক-চেয়ার, গড়গড়ার নল দিয়া সেইটা নির্দেশ করিয়া দীননাথ বলিলেন—“বোসো, তারপর? – অনেকদিন পরে দেখছি।”
আশুতোষ চেয়ারের পিছনে ঠেকনাটা ভালো করিয়া দেখিয়া লইয়া বসিতে বসিতে বলিলেন—“অনেকদিন পরে।…আরে দেখা হচ্ছে এই ঢের; চাল, নুন, কাপড়, তেলের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতেই দম ফুরিয়ে যায়।…তুমিও তো অনেকদিন যাওনি ও-পাড়ায়।”
দীননাথ হাসিয়া গড়গড়ার নলটা বাড়াইয়া ধরিয়া বলিলেন—“আরে তোমার তো তবু ফুরুবার মতন দম আছে; আমার আবার ওসবের ওপর ডেলি প্যাসেঞ্জারি।…নাও ধরো।”
আশুতোষ নলটা গ্রহণ করিতে করিতে বলিলেন—“আবার ওটি গছিয়ে দিচ্ছ? একে কুঁড়ে বলে বাড়িতে বদনাম আছেই…আসবার সময়ই গিন্নি টুকে দিলেন—তোমায় পাঠাচ্ছি বটে, কিন্তু নিশ্চিন্দি হতে পাচ্ছি না, ঠিক তুমি কোথাও আড্ডা জমিয়ে….”
দীননাথ বাধা দিয়া বলিলেন—“তুমি চিরকালটা ওদিককার ভয় নিয়েই রইলে আশু, আমাদের বদনাম দেওয়ার ভয়টা আর…”
দুই বন্ধুতে হো-হো করিয়া হাসিয়া উঠিলেন। ভিতরকার কথাটা এই যে, আশুতোষের স্ত্রৈণ বলিয়া একটু বদনাম আছে; আসর-আড্ডা জমাইবেন কি, কোনোকালেই তাঁহাকে জোর করিয়াও বেশিক্ষণ ধরিয়া রাখা যায় নাই। আশুতোষ হাসিতে হাসিতেই একটু লজ্জিতভাবে বলিলেন- “তোমাদের ওই এক কথা। আমার হয়েছে এদিকে আস্তাকুঁড়, ওদিকে বড়ঠাকুর—বাড়িতে ওই বদনাম, তোমাদের কাছে এলে…
রবিবার, তাহার উপর অনেকদিন পরে দেখা, সেইসব পুরানো কথা লইয়া দুই বন্ধুতে কিছুক্ষণ হাস্য রহস্যালাপ চলিল, গড়গড়ার নলটা হাত-ফের হইতে লাগিল। শেষবার নলটা বাড়াইয়া ধরিয়া আশুতোষ বলিলেন—“হ্যাঁ, এই দেখো, যার জন্যে আসা সে-কথাটা একেবারেই ভুলে গেছলাম—তবু তোমরা বদনাম দিতে ছাড়বে না; ইয়ে—কাল সকালে ওইখানেই খাবে।”
বেশ একটু অন্ধকার হইয়া আসিয়াছে, তবুও দীননাথের মুখের ভাবটা বন্ধুর দৃষ্টি এড়াইল না, বিস্মিত হইয়াই প্রশ্ন করিলেন—“ও কি দীনো, খাবার নামে হঠাৎ ওরকম হয়ে গেলে যে?”
দীননাথ ততক্ষণে একটা ছুতা ঠিক করিয়া লইয়াছেন, হাসিবার চেষ্টা করিয়া বলিলেন—“না, খেতে হবে সে তো তোফা খবর হে—তোমাদের দীনোর তেমনই ভোজনবিলাস আছে, বয়স হলে কি হয়; কিন্তু কথা হচ্ছে যাব কখন?—দশটা তেরোয় গাড়ি—তার মানে…”
আশুতোষ বাধা দিয়া বলিলেন—“তোমায় আমি ঠিক সময়েই খাইয়ে দোব, তারপর আমাদের স্টেশনেই উঠে পোড়ো, কাছেও হবে, পনেরো মিনিট বেশি সময়ও পাবে। না ভাই, যেতেই হবে; ছেলেটার অন্নপ্রাশন–বুড়ো বয়সের ছেলে—আর কত ভেঙে বলব তোমায়?…যাবে; না গেলে ভয়ানক দুঃখ হবে আমার ভাই…”
দীননাথ ততক্ষণে আরো সামলাইয়া লইয়াছেন, হাসিয়া বলিলেন- “যাব হে যাব, তুমি অত করে বলছ কেন? আমার নিজের টান নেই?—চেকরে মানুষ, তাই একটু ভাবিয়ে তুলেছিল; আর ছেলের ভাত, একথা বলোওনি তো আগে। মোদ্দা যত শিগগির ছেড়ে দিতে পারো আমায়।”
“আটটার সময় গেলেও তোয়ের পাবে, সাড়ে আটটায় আমাদের দুলুর গাড়ি যে। মোদ্দা দেখো—হ্যাঁ!”
