ফুলেশ্বরী

বনেদী ঘরের মেয়ে হওয়া খুবই ভালো, কিন্তু তাহার আর একটা দিকও আছে। মনে হয় আমি আকাশের চাঁদ, আমাকে পাইবার জন্য চেষ্টা করা আর আকাশের চাঁদ ধরিবার জন্য হাত বাড়ানো একই কথা।

ফুলির কথা হইতেছে, পুরো নাম ফুলেশ্বরী দাসী। ফুলির বাপ অর্জুন বৈরাগী ডাকগাড়ির ইঞ্জিনে কয়লা জোগাইত। কতদিন যাবৎ বলা শক্ত, তবে জ্ঞান হওয়া থেকে বয়স যখন বারো-তেরো তখন পর্যন্ত ফুলি বরাবর দেখিয়া আসিয়াছে গায়ে নীল জামা, একটা প্রকাণ্ড হাতা করিয়া বাবা ইঞ্জিনের পেটের মধ্যে কয়লা ছুঁড়িয়া দিতেছে। এক মুহূর্তের দেখা; কিন্তু তাহারই জন্য, মজা পুকুরের তালগাছগুলার ঠিক মাথার উপর সূয্যি-ঠাকুর যখন নামিয়া আসিত সমবয়সী সব ছেলেমেয়েদের লইয়া ফুলি রেলের গুমতির লোহার ফটকটায় বুক চাপিয়া দাঁড়াইত। ডাকগাড়ি আসিবে, গুমতির চৌকিদার ‘ডিটি’র জন্য উর্দি চড়াইতেছে, নানারকম, স-সম্ভ্রম প্রশ্ন—“ওরা বলছিল—শিগগির একদিন লাট-সায়েব যাবার কথা আচে, কবে গা তারু চাচা?…তুমি হে আজ পগ্‌গোও বাঁধলে মাথায়; আজই এসবে নাকি, তারু চাচা?”

লাল পতাকাটা গুটাইয়া আর সবুজটা মেলিয়া বেশ ভালো করিয়া একবার ঝাড়িয়া লইয়া তারু শেখ সামনে আসিয়া দাঁড়াইত, বলিত—“লাটের অতশত খবর রাখবার ফুরসত নেই আমার, গাড়ির লাট ডাকগাড়ি এসেছে, তাইতেই মাথা গুলিয়ে দেছে। খবরদার তোরা ফটক টপকে এসবিনি, আমার মন থাকবে অন্যদিকে; যদি টেনে লেয় কাউকে তো সামলাতে লারব!”

“আজ কি গাড়ি নেট আছে তারু চাচা?—তাই মনে হচ্ছে যেন–” ফটকের মধ্য দিয়া সকলে দূরে চাহিয়া থাকিত। জবাবটা দিত ফুলি—“জানিস না শুনিস না, যা তা বকিসনি-লোকে মনে করবে জানে না শোনে না, যা তা বকচে–বাবার গাড়ি নাকি লেট থাকতে পারে…তাও আবার ‘নেট’!…ওই ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে।”

না দেখা গেলেও কেহ প্রতিবাদ করিতে সাহস করিত না, উত্তর হইত—“হিঁ উই লি-লি!…”

তাহার পর এক সময় সত্যিই যেন লি-লি করে একটি কৃষ্ণ রেখা সে-ই স্টেশনের ওদিকে, একেবারে বহুদুরে—তাহার পর স্পষ্ট ধোঁয়ার কুণ্ডলী—তাহার পর ইঞ্জিনের মুখ, একটু কাঁপিয়া কাঁপিয়া আগাইয়া আসিতেছে, শব্দও একটু একটু করিয়া স্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে—একটা হুইস্‌ল দিল, এইবার স্টেশনে ঢুকিবে, দূর থেকে দেখা যায়—প্লাটফর্মের ধারের দিকে যাহারা দাঁড়াইয়া, সরিয়া মাঝের দিকে চলিয়া আসিল; যাহার বসিয়াছিল উঠিয়া দাঁড়াইল-ডাকগাড়ি গাড়ির লাটই কিনা, এ-সব ছোটখাটো স্টেশনের দিকে ঘুরিয়াও চাহিবে না—দাঁড়ানো তো দূরের কথা।…গুমতির এরা গেটের লোহা আরো কষিয়া বুকে চাপিয়া ধরিল, তারু শেখ পতাকা মেলিয়া ঠিক মাঝখানটিতে দাঁড়াইয়া বলিল—“খবরদার! রাক্কুসে ইঞ্জিন, যদি টেনে লেয় কাউকে তো না হক্ হেড আপিসের সঙ্গে নেকা-নেকিতে পড়ে যাব।”

হুস, হুস, হুস, হুস–স্টেশন পার হইয়া গেল-ধূলির একটা ঘূর্ণি তুলিয়া দিয়া,—তাহার পর এই আরো কাছে, আরো কাছে—ইঞ্জিনটা কাঁপিতেছে যেন ছিটকাইয়া বাহির হইয়া আসিবে—ভয়ের কিছু না থাকিলেও ভয়ে সবাই গেট ছাড়িয়া দুই পা করিয়া পিছাইয়া আসিল-ফুলি উদ্বেগে আনন্দে দুইটা মুঠা গলার ঠিক নিচেটিতে চাপিয়া বলিয়া উঠিল—“উই বাবা!”

একটি মুহূর্ত—অর্জুন বৈরাগী — গায়ে নীল জামা, মুখে ইঞ্জিনের পেটের আলো আসিয়া পড়িয়াছে, প্রকাণ্ড একটা হাতা করিয়া দিল এক হাতা কয়লা ছুঁড়িয়া সেই পেটের মধ্যে—দেবার সঙ্গে সঙ্গেই সবটা : আবার অদৃশ্য হইয়া গেল।

প্রতিদিনের জীবনে এ একটা এত বড় ঘটনা যে সকলেই খানিকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিত। … প্রথমে ফুলিই কথা কহিবে, সবটা কাণ্ড তাহার বাবারই তো? এক এক দিন, কি মনে হইলে তারু শেখও করিত গল্পসল্প; এক এক দিন গা-ঝাড়া দিত, দলটি ছাতিম তলায় সাঁকোর উপর গিয়া জড়ো হইত, মজা পুকুরের তালবনের পিছনে সূর্য রাঙা হইয়া আসিত, বাপের মুখে শোনা, ডাকগাড়ির ওই ইঞ্জিনের নুতন নূতন গল্প শোনাইয়া সবাইকে অবাক করিয়া তুলিত ফুলি!

.

এ গেল ফুলির ছেলেবেলাকার কথা। তাহার পর অনেক বৎসর কাটিয়া গেছে এবং অনেক পরিবর্তন হইয়াছে। অর্জুন বৈরাগী মারা গেছে, ফুলির দাদা অভিরাম ডাকগাড়ির ইঞ্জিনের খোরাক জোগায়। অভিরাম যে শুধু বংশগৌরবই বজায় রাখিয়াছে তাহা নয়, তাহার ইঞ্জিনও তেমনি,—আঠারো খানা চাকার উপর থাবা পাতিয়া বসিয়া আছে, আর কী দৌড়—ইস্টিশান যখন পেরোয়, এখানে গুমতি পর্যন্ত যেন কাঁপিতে থাকে! দু’নম্বর, তারু শেখের জায়গায় গুমতি-ম্যান এখন বৃন্দাবন। তিন নম্বর, ফুলির এখন ভরা বয়স। চার নম্বরের পরিবর্তনও হওয়া উচিত ছিল একটা, অর্থাৎ ফুলির বিবাহ; কিন্তু সেটা এখনো হয় নাই। না হওয়ার একটা কারণ—তদ্বির করা চাই তো? কিন্তু করে কে? অভিরামের যা কাজ, একেবারেই ফুরসত নাই; সপ্তাহে কদিন তো বাড়ি আসিতেই পারে না, যে কটা দিন আসে বাড়িতেই নেশা করিয়া পড়িয়া থাকে। প্রতিবেশিনীরা অভিরামের বউকে বলে—“নিজের খোঁজাখুঁজি করবার অসোর নেই, তা পাড়ার পাঁচজন মাতব্বরের কাছে যাক্, ধরুক্; বয়েস, না বানের জল,—চোখ বুজে থাকাটা ভালো দেখায় আর? বুন কিনা, তাই; মেয়ে হলে পারতো?”

ফুলির কানে উঠিলে ফুলি রাগিয়া যায়, ঠোঁট দুইটা কুঁচকাইয়া পাঁচ বাড়ি পর্যন্ত আওয়াজ যায় এরূপ কণ্ঠে বলে,—“ফুলির কথা ভাবতে হবে না, সব নিজের চরকায় তেল দিক্। হেলো চাষার গাঁ, তার আবার মাতব্বর! দাদাকে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা কইতে হবে! গেচি আর কি!”

উত্তর যে না হয় এমন নয়—“চাকরির গুমর! অতচ চাকরি কি, না ইঞ্জিনে কয়লা ঠেলা—তা ডাকগাড়িই বা কি আর মালগাড়িই বা কি…বলে লোকে, চোখে নাগে বলে—গাঁয়ের মধ্যেই তো!… বে হচ্ছে না, তা না হয় একটু হায়া করেই থাক—বলে নোকে কি সাধ করে?”

সবই কিন্তু নেপথ্যে; গলা খুলিয়া ফুলির কথার জবাব দেয় এমন বুকের পাটা কাছে-পিঠে কাহারও নাই। ফলে কথা আর বাড়ে না; এইভাবে চলিতেছে।

এইভাবে উপরে উপরে চলিতেছে বলাই ঠিক, কেননা ভিতরে ভিতরে আর একটি ঘটনাস্রোত প্রবল হইয়া উঠিতেছে। খুব যে ভিতরে ভিতরে এমনও নয়; ছোট গ্রাম, কথাটা প্রায় জানাজানি হইয়া আসিতেছে।

গুমতি-ম্যান বৃন্দাবনের বাড়ি একটা গ্রাম বাদ দিয়াই, ক্রোশ-খানেকের পথ নয়। বেশ গাঁট্টাগোট্টা চেহারা, বছর পঁচিশ-ছাব্বিশ বয়স, মাথায় বাবরি,—ভালো করিয়া ছাঁটা, ভালো করিয়া আঁচড়ানো। চুপ করিয়া থাকে, কিন্তু বসিয়া থাকে না; আসিয়াই পাশের খানিকটা জায়গা কোপাইয়া একটু বাগান করিয়াছে, কঞ্চির বেড়া, ভিতরে দু’তিনরকম আনাজ; চার দিকে রাঙা-নটে ডাঁটা; গুমতির চারকোণে চারটি করবীর ঝাড় বসাইয়াছে, তিন কেয়ারি নয়নতারা দু’তিনরকম পাতা বাহার। বাঁশের আগালে দিয়া গুমতির ছাতে একটা মালতীর চারাও তুলিয়াছে।

এই এতগুলি ব্যাপার হঠাৎ একদিন ফুলির চোখে পড়িল। সে বড়-নদীর ওপারে মামার বাড়ি গিয়া অসুখে পড়িয়া গিয়াছিল। অসুখটা সারিতে এবং তাহার পর গায়ে একটু গত্তি হইতে প্রায় মাস চারেক লাগিয়া গেল। যেদিন ফিরিল, চিরকালের অভ্যাসমতো কাঁকালে ঘড়া লইয়া মজাপুকুর হইতে জল আনিতে যাইতেছিল—রেল পারাইয়া যাইতে হয়-গুমতির চেহারা দেখিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া কয়েকবার চাহিতে চাহিতে গেল। বেশ লাগিল; অসুখের পরে অত্যন্ত সাধারণ পুরনো জিনিসও সব বড় মিষ্ট লাগিতেছে, ফুল-ফসলের মধ্যে গুমতিঘরটি আরো ভালো লাগিল। ভালো লাগার সঙ্গে সঙ্গে একটা কৌতূহলও জাগিল ফুলির মনে। গুমতি-ম্যান যে বদল হইয়াছে এটা এমন কিছু প্রকাণ্ড খবর নয় যে ভাজ তাহাকে বাড়ি আসিতেই শোনাইবে,—মজাপুকুরের দিকে অগ্রসর হইতে ফুলির মুখে একটা হাসি ফুটিল,—এতদিন গিয়া বুড়া বয়সে হঠাৎ তারু চাচার এত শখ আসিল কোথা হইতে? বুড়িকে তালাক দিয়া নূতন চাচি কাড়িল নাকি? গল্প প্রসঙ্গে মাঝে মাঝে বলিত বটে, রেলের চাকরে বলিয়া — তাহার উপর অনেক বেওয়া বিবিদের নজর আছে, দু’একজন জোয়ানও আছে তাহাদের মধ্যে। পুরানো লোক, তায় বুড়া, গাঁয়ের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ঠাট্টা প্রসঙ্গে গল্প চলিত; চাচা শেষ পর্যন্ত কথায় কাজে এক করিল নাকি। বড় কৌতুক বোধ হইল ফুলির, ঘাটের ভাঙা রাণায় বসিয়া আবোল-তাবোল কি সব ভাবিল—বোধ হয় বুড়ো তারু আর নূতন চাচির অভিনব জীবনযাত্রার কথা, অনেকবারেই মুখে মিটি মিটি হাসি ফুটিল ফুলির; তাহার পর এক সময় ঘড়া ভরিয়া বাড়িমুখো হইল; বেলা পড়িয়া আসিতেছে।

গুমতির কাছাকাছি আসিয়া ফুলির মাথায় এক ভূত চাপিল; বুড়া বয়সে জোয়ান বৌ করিয়াছে চাচা, প্রাণে নূতন শখের জোয়ার আসিয়াছে, ফলেফুলে গুমতিটাকে পর্যন্ত স্বগপুরী করিয়া তুলিয়াছে— ঠাট্টার এমন সুযোগটা ছাড়িয়া যাইবে ফুলি? –মরিলেও আপশোশ যাইবে না যে!

গুমতি থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী বাহির হইতেছে, চাচা এই সময় রান্নার পাট সারিয়া লয়। ফুলি ঘড়া-কাঁখে দুলিতে দুলিতে অগ্রসর হইল। গুমতির মুখের কাছাকাছি আসিয়া বেশ সরস করিয়া হাসিতে হাসিতে আরম্ভ করিল—“বলি হ্যাঁ চাচা, একটু চোখের আড়াল হয়েচি আর ফাঁকি দিয়ে…”

“কে?”—বলিয়া বৃন্দাবন হালকা ধোঁয়ার মধ্যে গুমতির মুখের কাছটিতে আসিয়া দাঁড়াইল।

দুজনে খানিকক্ষণ পাথরের মূর্তির মতো সামনা-সামনি হইয়া দাঁড়াইয়া রহিল। সম্বিৎ ফিরিল প্রথমে ফুলিরই; বেশ সহজভাবেই বলিল—“আমি তারু চাচাকে খুঁজছিনু!”

“তিনি তো রিটার করেছে, আজ মাস তিন হল।”

বৃন্দাবন কি ভাবিয়া ইংরাজি কথাটা বলিল সে-ই জানে, তবে চাকরি লইয়া এ ধরনের কিছু কিছু কথা ফুলির জানা, ওর বাপও ‘রিটার’ করিয়া পেনশন লইয়াছিল—অর্থটা বুঝিল। বলিল—“ও। আমায় কেউ বলেনি, তাই….”

বৃন্দাবন বলিল—“ও। না, তিনি তো রিটার করেছে; আমি তাঁর জায়গায় বাহালি হোনু।”

“ও”—বলিয়া ঘুরিয়া আবার দুলিতে দুলিতে ফুলি বাড়িমুখো হইল। গতি উহারই মধ্যে যেন একটু ত্বরিত।

রেলের গুমতির মতো নীরস জায়গায় যে ফুলের স্বপ্ন দেখে তাহার মনের গঠন যে একটু অন্য ধরনের এ-কথা স্বীকার করিতেই হইবে এবং তাহার আস্তানার সামনে দিয়া একটি মেয়ে যদি নিত্য ঘড়া লইয়া জল আনিতে যায় তো তাহার ফুলের আদর যে আরো বাড়িবে তাহাতেও কিছু আশ্চর্য হইবার নাই। আদরে যত্নে নয়নতারার গাছগুলি গোলাপী ফুলে বোঝাই হইয়া চাপ বাঁধিয়া উঠিল, গোড়া থেকে নূতন নূতন অঙ্কুর বাহির হইয়া করবীর ঝাড় চারটি হইয়া উঠিল আরো পুষ্ট; কয়েক ঝাড় বেলা আসিয়া উপস্থিত হইল, স্থান পরিবর্তনের কয়েকদিন একটু নির্জীব হইয়া রহিল, তাহার পরই মরা পাতা ঝরিয়া গিয়া আদরে যত্নে হরিময় হইয়া উঠিল। মালতী চারাটিও তাড়াহুড়া করিয়া বাড়িয়া উঠিবার তাগিদে বাঁশের আগালেটার অনেকখানি ঢাকিয়া ফেলিল। তরকারির বাগানটা রহিল, তবে ঝিঙের লতার কোলে কোলে তরুলতার গাঢ় সবুজ ঝিরঝিরে পাতার গুচ্ছ দোল খাইতে লাগিল, জায়গায় জায়গায় এক আধটা রাঙা টকটকে ফুলও উঁকি মারিতে লাগিল। অবশ্য একদিনে হইল না, তবে প্রতিদিনই কিছু কিছু হইয়া চলিল।

ফুলি জল ভরিতে যায়। প্রায়ই সঙ্গে প্রতিবেশী অন্য কোনো মেয়ে থাকে, একজন হোক, দুজন হোক, আরো বেশি হোক; যেদিন থাকে না, ফুলি ভাইপেটিকে সঙ্গে লয়। ছেলেটির নাম কেষ্ট, বয়স বছর আষ্টেক; সে থাকিলেই ফুলির সুবিধা হয় বেশি। গুমতি পার হইয়াই আরম্ভ করে—“তারু চাচা দিব্যিটি ছেল, নারে কেষ্ট?”

কেষ্ট উত্তর দেয়—“হুঁ।”

“আর এ-বাবুর বাগানেরই কি বাহার….করো কি তুমি বাপু?…না, আমি গেট বন্ধ করে গাড়িতে ফেলাক দেখাই! ওরে বাস রে, কত দরের লোকটা তার একটা ফুলবাগান না হলে চলে?”

মাথা দুলাইয়া দুলাইয়া কথাটা বলিয়া খিল খিল করিয়া হাসিয়া ওঠে।

কেষ্টও হাসিয়া ঘাড় ফিরাইয়া গুমতির পানে চায়; ফুলি সামনের দিকে চাহিয়াই প্রশ্ন করে – “হাসিটে আমার দেখতে পেলে না কিরে কেষ্ট? চেয়ে আছে কি এদিক পানে?”

কেষ্ট একটু চাপা গলায় বলে—“দেখছেলো, আমি তাকাতে মুখ ফিইরে নিলে। ফেরবার সময় চটে গেট বন্ধ করে দেবে না তো রে পিসি?”

দারুণ অবজ্ঞার ফুলির ঠোঁট দুইটা কুঁচকাইয়া ওঠে, বলে—“সাদ্যি!…কার মেয়ে, কার বুন তা মনে রাখে যেন। তোর বাপ কার পাশে দেঁইড়ে কাজ করে একেবার দেখতে বলিস,–আনকোরা বিলিতি সাহেব, টকটকে হাঁড়িপানা মুখ, গুমতি-ম্যান হলে সেলাম ঠুকতে ঠুকতেই হাতে বাত ধরে যেত! … গেট বন্ধ করবে…”

ঠোঁট দুইটা খুব চাপিয়া মাথাটা দুলাইয়া দেয়।

বৃন্দাবনেরও দোষ নাই, কেষ্টারও একটা ছেলেমানুষি আশঙ্কা মাত্র, কিন্তু এমন জায়গায় ঘা পড়ে, অনেকক্ষণ পর্যন্তই ফুলির গরগরানি আর যায় না! দুই পুরুষ লইয়া যাহাদের বাড়িতে ডাকগাড়ি হাঁকাইতেছে তাহার সামনে এক ফেলাক-দেখানে গুমতি-ম্যান!

এক একদিন কি খেয়াল হয়, সাজের মধ্যে একটু অভিনবত্ব আমদানি করে ফুলি, রাঙা গামছাটা হাতে না লইয়া শাড়ির আঁচল ঢাকিয়া বুক-পিঠের উপর ফেলিয়া দেয়, শাড়িটাও বোধ হয় একটু ভালোই পরে, আর এলোচুলের আগায় একটা গেরো দিয়া সমস্ত চুল সুদ্ধ মাথার ঠিক মাঝখানটিতে বসাইয়া দেয়।

গুমতি পার হইয়া প্রশ্ন করে—“দেখছেলো নাকি রে কেষ্ট ড্যাবা ড্যাবা চোখ মেলে?”

কেষ্ট চকিতে একবার দেখিয়া লইয়া তখনই মুখটা ঘুরাইয়া লয়, বলে—“দেখছেলই তো, আমি তাকাতে ঝট করে মুখটা ফিইরে নিলে।”

ফুলি একটু চুপ করিয়া থাকে, তাহার পর প্রশ্ন করে—“আজ আমি কেষ্টচুড়োর মতন করে চুলটা মাথে তুলে দিচি কেনে বল তো রে কেষ্টা?”

“কেনে রে পিসি?”

“গুমতি-ম্যানের মাথায় বাবরির বাহার দেখিস নে?…তুমি লোকটা কে বাপু?—না, আমি চলন্ত গাড়িকে ফেলাক দেখাই!…তাই তো তোকে জিগোলাম—দেখচে কিনা। দেখুক—বাবরি আমার মাথেও আচে—আমিও এইরকম করে দুলিয়ে দুলিয়ে…”

মাথার অল্প একটু দোল দিয়া খিল খিল করিয়া হাসিয়া ওঠে।

VIDEO | ভিডিও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

তোমার জন্য - গল্প

বুলা বৌদি

গুদের ডাক

রাজপুরোহিত