ভাড়া

কাজটা বোধ হয় অন্যায় হইয়া গিয়াছিল, কিন্তু কাঠ-রসিকতার জ্বালায় মনের অবস্থা তখন এমন দাঁড়াইয়াছিল যে, ও কথাটা ভাবিয়া দেখিবার অবসর হয় নাই। এখনো যে খুব অনুতপ্ত আমি এ কথাও ধর্মসাক্ষী করিয়া বলিতে পারি না।

বরযাত্রীর দল, কলিকাতা হইতে লুপ লাইনে সাহেবগঞ্জ যাইতেছে। একে বরযাত্রী, তায় কলিকাতার, তাহার উপর আবার যাইতেছে বেহারে—সকলেরই যথাসম্ভব স্মার্ট আর রসিক হইবার চেষ্টা কিন্তু সুবিধা হইতেছে না। শেষে লুপ এক্সপ্রেসটা যখন কোন্নগর পার হইল তখন একজন বলিল—“না, এ জমছে না, সেরামপুরে গড়ি থামলে বরদা খুড়োকে টেনে নিয়ে আসতে হবে বরের গাড়ি থেকে–বাঃ, ওঁরা বরও নেবেন আবার বরদাও নেবেন!

গাড়িটা প্রায় ওরাই বোঝাই করিয়া রাখিয়াছে, সমর্থনের একটা তুমুল কলরব উঠিল—“খুড়োকে চাই ….খুড়োকে চাই।…আমাদের খুড়োকে চাই!…বাঃ, বর বরদা দুই নেবে, মাংনা নাকি?…”

অযথাই কলরবের সঙ্গে একটা হাসি উঠিল, একজন দাঁড়াইয়া উঠিয়া “খুড়ো হে!–এসো হে আধ আঁচরে বোস হে!”…বলিয়া যাত্রার জুড়ির মতো হাত খেলাইয়া তান ধরিয়া দিল, একজন উঠিয়া তাহার টুটিটা ধরিয়া নাড়া দিয়া গানের গিটকিরি তৈয়ার করিয়া চলিল; হাসির আর একটা তোড় উঠিল।

এদের সঙ্গে আমায় বর্ধমান পর্যন্ত যাইতে হইবে, অস্থির হইয়া পড়িয়াছি যাই হোক, একটু আশান্বিত হইলাম, যাহার নাম উচ্চারণেই এতটা উল্লাস তাহাকে দেখিবার জন্য কৌতূহল লইয়া বসিয়া রহিলাম।

গাড়িটা সেরামপুরে থামিতে প্রায় অর্ধেক লোক হই-হই করিতে করিতে নামিয়া গেল, বরের গাড়িতে হাসি-হল্লার মধ্যেই একটা টানাটানি পড়িয়া গেল—ওরাও ছাড়িবে না, এরাও নিরস্ত হইবে না—তাহার পর “থ্রি চিয়ার্স ফর খুড়ো!…লং লিভ খুড়ো!…খুড়ো জিন্দাবাদ!”—বলিতে বলিতে সমস্ত প্লাটফর্ম কাঁপাইয়া একটি লোককে মাঝে করিয়া সবাই এ কামরায় আসিয়া উঠিল, গাড়িটা ছাড়িয়া দিল। লোকটা বেঁটেসেঁটে গোলগাল, মাথায় টাক, তাহার নিচে বাবরি; মোটা একজোড়া গোঁফ বাটারফ্লাই করিয়া ছাঁটা; সর্বসাকুল্যে চেহারাটায় একটু হাসির উদ্রেক করে, তাহার উপর মুখটা আর চোখ দুইটা এমনভাবে একটু কুঞ্চিত যে, মনে হয় যেন এখনই ভয়ানক একটা হাসির কথা বলিবে বা হাসির কিছু একটা করিবে। বয়স বছর পঁয়ত্রিশ হইবে।

গাড়ির মধ্যে আসিয়াই লোকটা হঠাৎ থমকিয়া দাঁড়াইল, চোখ-মুখ আরো কুঞ্চিত করিয়া চারিদিকে একবার চাহিয়া লইল; অত যে গোলমাল এক মুহূর্তেই ঠাণ্ডা হইয়া গিয়া সবাই মস্ত বড় কিছু একটা প্রত্যাশা করিয়া তাহার দিকে চাহিয়া রহিল, দু’একটা চাপা হাসির খুকখুক শব্দ হইল, একটু থামিয়া একজন বলিল,—“কি খুড়ো?—তুমি যে একেবারে স্ট্যাচু মেরে আলোর দিকে চেয়ে রইলে!”

খুড়ো বিমুঢ়ভাবে আর একবার চারিদিকে চাহিয়া বলিল,—“এ কি! আমার গান পাচ্ছে কেন এত!”

চাপা হাসির সংখ্যা আরো বাড়িয়া গেল, একজন বলিল,—“তা গান পাচ্ছে তো গাও না বাবা, সেই জন্যেই তো তোমায় পাকড়াও করে আনা…”

খুড়ো বাঁ হাতে কানটা ঢাকিয়া ডান হাতটা লম্বা করিয়া বাড়াইয়া দিয়া একেবারে সপ্তমে তান ধরিল—“শ্মশানে কেন মা গিরিকুমারী, কেন বা তোমার এ-হেন বে-এ-এ-শ!”

প্রচণ্ড হাসির চোটে মনে হইল যেন ছাতটা ভাঙিয়া পড়িবে, সেই সঙ্গে নানারকম বুলি—“থ্রি চিয়ার্স ফর খুড়ো! এনকোর খুড়ো এনকোর….এনকোর।”

তোড়টা একটু থামিলে দু’একজন হাসিতে হাসিতেই বলিল—“আর গান খুঁজে পেলে না বাবা?… বাসরঘরে এই গানই গেয়েছিলে নাকি খুড়ো? এ যে বরযাত্রী গো…”

খুড়ো হাত দুটো চিতাইয়া নিরীহভাবে বলিল—“বরয়াত্রী কি শ্মশানযাত্রী কি করে বুঝব বাপধনেরা? একেবারে যে নিঝুমের পালা চলেছিল…

সবার হাসির মধ্যেই এদিকে চাহিয়া হঠাৎ আমায় সাক্ষী মানিল—“কি মশাই, একেবারে শ্মশান করে রাখেনি?”

আমার পিত্ত জ্বলিয়া যাইতেছিল, ভাবিয়াছিলাম যেরকম জুলুম করিয়া আনা, বোধ হয় একজন প্রকৃত হাস্যরসিকের সঙ্গ পাওয়া যাইবে, এ একেবারে চড়কতলার সং! উত্তর দিবার প্রবৃত্তি না থাকায় চুপ করিয়া ছিলাম, খুড়ো ভয় এবং দুঃখের অভিনয় করিয়া বলিল—“কি মশাই, একটু সমর্থন করুন, একা পড়ে যাচ্ছি যে,–করে রাখেনি শ্মশান?

একটু খুক খুক করিয়া শব্দ হইল, বোধ হয় একটি অপরিচিত ভদ্রলোককে এভাবে কোণঠাসা হইতে দেখিয়া। আমি বলিলাম—“আজ্ঞে, এতক্ষণ ততটা বুঝতে পারিনি, এখন শেয়াল ডাকার শব্দে আর সন্দেহ নেই বটে।”

খুক-খুক শব্দটা আরো কয়েক কণ্ঠে চারাইয়া পড়িল, খুড়ো একটু যেন অপ্রস্তুত হইয়া পড়িল; কিন্তু একেবারে দু’কান কাটা, তখনই সামলাইয়া লইল;—আমার দিক থেকে ফিরিয়া বলিল—“শুনলে তো? এইবার একটা বিড়ি কি সিগারেট ছাড়ো দিকিন, শেয়ালের গলা ভেঙে গেছে, একবার শানিয়ে নিতে হবে—”

—বলিয়া মুখটা উঁচু করিয়া হাত দুটো বাড়াইয়া ধরিল এবং গলাটা চাপিয়া ভাঙা গলার মতো করিয়া চেঁচাইয়া উঠিল—“হুয়া কাক্কা—বিড়ি! হুয়া কাক্কা—সিগারেট!”

আবার একটা প্রচণ্ড হাসির তোড় উঠিল এবং আমার পরাভবে কয়েকটা তির্যক দৃষ্টি আমার উপর আসিয়া পড়িল। এই সময় কোনো কারণে সিগন্যাল না পাওয়ায় গাড়িটা আসিয়া শেওড়াফুলিতে দাঁড়াইয়া পড়িল।

.

VIDEO | ভিডিও

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

তোমার জন্য - গল্প

গুদের ডাক